• আজ- বৃহস্পতিবার, ২২ ফেব্রুয়ারী ২০২৪, ০৬:১০ পূর্বাহ্ন
Logo

ডা. মো. ডা.

হাসান শরাফত / ১২৮ বার দেখা হয়েছে
আপডেট : বুধবার, ২০ ডিসেম্বর, ২০২৩

add 1
  • হাসান শরাফত

শীতের কুয়াশা ভেদ করে সূর্য মামা পূর্বাকাশে আবির্ভূত হয়েছে। এসময় মিষ্টি রোদ পোহাতে কার না ভালো লাগে। তিথি ছোট বেলা থেকেই বেশী রাত জেগে পড়াশুনা করতো না। উঠতো ভোর বেলায়। নামাজ শেষ করে অন্ধকার কেটে গেলেই ছাদে গিয়ে কিছুক্ষণ হাটাহাটি করে, ফ্রেস হয়ে চা নাস্তা করে পড়তে বসত। এই অভ্যাস হাই স্কুলের পাঠ শুরুর হওয়ার সময় থেকেই। কলেজে পা রাখলেও তা অব্যাহত রয়েছে। যদিও শীত ও গ্রীষ্মের পরিবর্তনের সাথে সামান্য পরিবর্তন হয়। শীতকালে সূর্যের উঠার আগে যাওয়া হয় না, কম্বলের ভিতরেই পাখির বাসার মত তৈরী, সেখানেই পড়াশুনা করে। মাঝে মাঝে পাতা উল্টানোর জন্য শুধু হাত বের করে। সূর্যের আবির্ভাব অনুভব করতেই গা থেকে কম্বলটি ঝেড়ে ছাদের দিকে পা বাড়ায়। বেশিরভাগ সময় মোবাইল ফোনটি টেবিলে রেখে ছাদে চলে যায় । কিন্তু আজকে কেন জানি অন্যমনষ্কভাবে মোবাইলটি তার সু-কোমল হাতে আশ্রয় পেল। ঘুম ভাঙ্গার সাথে সাথে মানুষের কানে প্রথম যা ভাসে অথবা কল্পনা করে সারাদিন নাকি মানুষের মনে তাই বাজতে থাকে। আজ তিথির ঘুম ভাঙ্গার সাথে কেন জানি গতকালের ক্যাম্পাসে বসে আলোচনা করা তার প্রিয় বান্ধবী পিংকির কথাই স্মরণ হচ্ছিল। কত স্বপ্ন ছিল তার বড় হয়ে ডাক্তার কিংবা ইঞ্জিনিয়ার হবে। মেডিক্যাল কিংবা ইঞ্জিনিয়ারে চান্স না পেলেও বাবার যে সম্পদ আছে তা দিয়ে প্রাইভেটভাবে মেডিক্যাল এ পড়া তার জন্য অসম্ভব কিছু না। এটা অবশ্য ছোটবেলা থেকেই অহংকার করেই সবার সাথে বলতো। অথচ ভাগ্যের কি নির্মম পরিহাস আজ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এসএসসি পরীক্ষা দেওয়ার জন্য ফর্মফিলাপ করতে এসেছিল। হঠাৎ তার সাথে দেখা হয়ে যায়। তিথিদের উজ্বল ঝলমলে হাসির কাছে পিংকির জীবনযুদ্ধে পরাজয়ের প্রতিচ্ছবিই যেন তার চোখে মুখে বার বার ভেসে উঠেছিল।

এটা হতে পারে পিংকির অহংকারের ফল, আর না হয় পিংকির দাদার খামখেয়ালিপনার ফসল। তার দাদা সোহরাব মন্ডল আগেকার দিনের মানুষ। বয়স নব্বইয়ের ঘরে ছুই ছুই। একরোখা ধরনের মানুষ, যখন মনে যা আসে তাই করেন। তার কথার উপর কথা বলার সাহস এইরপরিবারের কারো নেই। তিনি পিংকির জন্মের সময় ঘটা করে সবাইকে বলেছেন, মেয়ের ঘরের নাতিনের সাথে তার বিয়ে দিবেন। মৃত্যু শয্যাতে এসেও তা ভুলেননী । তার মৃত্যুর আগে শেষ চাওয়া নাতনীর বিয়ে দেখে যাবেন। পিংকি সবেমাত্র ক্লাস নাইনে পড়ে। সবাই মিলে তাকে বুঝানোর চেষ্টা করলেন মেয়ে ছোট, কেবলমাত্র ক্লাস নাইনে পড়ে। তাদের পড়াশুনা আরেকটু এগুলে পরে না হয় চিন্তা করা যাবে। বুড়ার এক কথা আমি যখন তোর মাকে বিয়ে করেছি, তখন সে কোন ক্লাসে পড়ত জানিস, ক্লাস ফাইভে। আমরা কি সংসার করি নাই। পরবর্তীতে যে কেউ বুঝাতে আসেলেই মাথা ঘুরিয়ে অন্যদিক করে ফেলত। ছেলেরা বাবার এ অবস্থা দেখে বিয়ের আয়োজন করতে বাধ্য হলো। ওদিকে ছেলের দাদাও বিয়াই এর সাথে কথা দেওয়ায় এবং তাড়াতাড়ি নাত বউয়ের সেবা যত্নের লোভে ভুলেই গেলেন ছোটবেলা থেকেই সবার সাথে বলে আসা নাতীকে ডাক্তার বানানোর কথা। অশিক্ষিত ছিলেন, কিন্তু তার চালচলনে পূর্ব পুরুষের জমিদারীর ভাব লেগেই থাকতো। বাজারে গেলে সবচাইতে বড় মাছ তাকে কিনতেই হবে। প্রতি সপ্তাহে একটি খাসি বাড়ির দখলে জবাই করতে না পারলে সম্মান চলে যাবে। এই ধারাবাহিকতা রক্ষা করতে গিয়ে সমস্ত সম্পদ তিনি শেষ করে ফেলেছেন। নাতী অত্যন্ত ভালো ছাত্র হওয়া সত্বেও শহরের ভালো প্রতিষ্ঠানে লেখাপড়া করানোর সামর্থ তার হয়নি। অথচ ক্লাসে প্রথম হয়ে তার হাত থেকে পুরস্কার নিতে আসছিল, সেদিন ম্যানেজিং কমিটির সদস্য হিসেবে এবং প্রভাব প্রতিপত্তির জোড়ে সবার সামনে তিনি ঘোষণা করেছিলেন, আপনেরা দোওয়া করবেন, ভবিষ্যতে নাতনিরে আমি ডাক্তার বানামু। আজ বিয়ের আনন্দে আত্মহারা হয়ে এবং নিজের জমিদারীর প্রভাব রক্ষা করতে গিয়ে সবই আপনার জগতেই হারিয়ে গেছে। পিংকি ছোটবেলা থেকেই ছিলো অতি আধুনিক। বড় শহরের মেয়েদের চালচলন অনুসরণ করে চলার চেষ্টা করত। অপর দিকে ছেলেটি ছিল অত্যন্ত সহজ সরল, ভালো মানুষ। পিংকি চেয়েছিল, সে হাতে চেইন পড়বে, লম্বা চুল, কালো সানগ্লাস এবং জিন্স পড়ে চলাফেরা করবে। কিন্তু ছোটবেলা থেকে অতি সাধারণভাবে চলার অভ্যাস কিছুতেই ত্যাগ করতে পারছিল না। এটা পিংকির কাছে খুবই হাবাগোবা মনে হত। কিছুতেই তার সাথে মানিয়ে নিয়ে চলতে পারছিল না। অথবা ইচ্ছা করলে তাকে ভালোবাসা দিয়ে তাকে তার মনের মত করে গড়তে পারত। কিন্তু তা না করে প্রতিনিয়ত খুজতে থাকে ভিন্ন পথ। সারাক্ষণ যেন একটা অস্থিরতা তাকে তাড়া করে বেড়ায়।

অস্থিরতার জন্য একদিকে যেমন পড়াশুনাতে মন বসাতে পারেনি পিংকি, ঠিক একই স্বভাবের কারণে একটা কারখানাতেও বেশিদিন কাজ করতে পারে না কফিল মেম্বারের ছেলে ঝন্টু। সৈয়দ মুস্তবা আলীর রচিত রসগোল্লা গল্পের ঝান্ডুদার মতো তাকে রাস্তায় দেখে বুঝার উপায় নেই সে ঢাকা যাচ্ছে না ঢাকা থেকে ফিরছে। বাপের মেম্বারি থেকে অবৈধ উপায়ে উপার্জিত টাকা এভাবেই দীর্ঘদিন যাবৎ খরচ করে আসছিল। কিন্তু এবছর নির্বাচনে ফেল পড়ায় এবং নির্বাচনে বহু টাকা খরচ করার কারণে বর্তমানে প্রায় নিস্ব অবস্থা। কিন্তু ঝন্টুর ভাবখানা দেখে মনে হয় বাংলা সিনেমার ইয়ং ভিলেন ফেল। হাতে বিভিন্ন কালারের প্লাস্টিকের বেন্ড, গলায় বড় বড় গোটার মালা এবং কালো সানগ্লাস ও চিপা জিন্স পরে সারা এলাকা ঘুরাই যেন তার কাজ। ঘরতে ঘেুরতে হঠাৎ চোখে পড়ে পাশের বাড়ির সামনে একজন অত্যাধুনিক মেয়ে হাটাহাটি করছে।

যে, যে প্রকৃতির মানুষ ঐ প্রকৃতির আরেকজন মানুষের সাথে সখ্যতা গড়ে উঠে তাড়াতাড়ি। ঝন্টুকে দেখেই একটা ভেংচি কাটে পিংকি। ফলে সুযোগ পেয়ে বসে ঝন্টু। আপু, আগে তো কোনদিন আপনাকে এই এলাকায় দেখিনি, রাজধানী থেকে এসেছেন বুঝি?

-কেন? আমাকে দেখে কি রাজধানীর মেয়ের মতো মনে হয়। গর্বে যেন তার বুকটা ভরে উঠে। আগ বাড়িয়ে বলে আপনি বুঝি শহরে থাকেন।

-হ্যা, আমি ঢাকাতে থাকি। কিছুদিনের ছুটিতে বাড়ি এসেছি। এলাকা ঘুরে ঘুরে দেখছি। ভাবসাব এমন যেন বড় কোনো শিল্পপতি। পরিচয় হওয়ার একপর্যায়ে বলে আচ্ছা ঠিক আছে, আজ সন্ধ্যায় আপনাদের বাড়িতে বেড়াতে আসবো।

ঠিক সন্ধ্যা বেলায় ঝন্টু এসে হাজির। কিরে দোস্ত বিয়ে সাদি করলি জানালি না যে।

-সময় পায়নি। ওর দাদা অসুস্থ্য ছিল তো, খুব তাড়াতাড়ি বিয়েটা হয়ে গেছে।

-পিংকি কৌশলে তার বন্ধুর জন্য বিস্কিট আনতে পাঠিয়ে ঝন্টুর সাথে ভাব জমায়। এক পর্যায়ে বলেই ফেলে আপনার স্মার্টনেস আমার খুব ভালো লাগে। এরকম স্বপ্ন আমারও ছিল কিন্তু কি থেকে যে কেমনে কি হলো তা বুঝে উঠতে পারিনী। এই বলে একটা জুড়ে নিঃশ্বাস ছাড়ে।

-আরে ভাবি আপনি গ্রামে থাকলেও আপনার যে স্মার্টনেস তা গ্রামে মানায় না।

-না মানালেই কি আর করা ঢাকা থাকার সুভাগ্য তো হবে না।

-যদি হয় তাহলে কি যাবেন।

-কেন যাব না।

-ভাবি আপনি কি আমার সাথে ইয়ার্কি করছেন।

-ইয়ার্কি করব কেন? আপনি বলে দেইখেন যাই কিনা।

সেদিন বিদায় নেওয়ার পর আরও কয়েকদিন কথা হয় পিংকির সাথে এবং তাদের মধ্যে সম্পর্ক গড়ে উঠে। অবশেষে সত্যি সত্যি একদিন রাতের বেলায় ঝন্টুর সঙ্গে পালিয়ে ঢাকা চলে যায়। কিন্তু পিংকি ঢাকায় গিয়ে হতবাক হয়ে যায়। ঝন্টু ঢাকার এক বস্তিতে ছোট একটি রোম নিয়ে থাকে। খুব কস্টে তাদের জীবন প্রবাহ চলতে থাকে। তিনমাসের মাথায় হঠাৎ একদিন সকালবেলা কয়েকজন লোক নিয়ে হাজির হয় রত্না নামের এক মেয়ে। তার সাথে নাকি ঝন্টুর চার মাস আগে রেজিস্ট্রি করে বিয়ে হয়েছে। পিংকিকে হুমকি দিয়ে বলে, অনেক কস্ট করে বাসার ঠিকানা পেয়েছি। ঝন্টু পালিয়ে তোকে নিয়ে এখানে উঠেছে। তবে সাবধান করে যাচ্ছি ভালোই ভালোই চলে যাবি। পরে যেদিন আসব তোকে যেন না দেখি। আর ঝন্টু আসলে বলবি রত্না এসেছিল। এ সপ্তাহের ভিতরে যেন আগের বাসায় চলে যায়। পিংকির যেন আকাশ ভেঙ্গে মাথায় পরে। কি করবে কোনো উপায় খুজে পায় না। ঝন্টু বাসায় আসলে এসব বলতে গেলে তার উপর শারিরীক নির্যাতন চালায়। বুঝতে পারে তার সাথে মানিয়ে চলা আর সম্ভব না, তাই সেদিন রাতের অন্ধকারে পা বাড়ায় অজানা উদ্দেশ্যে। পথিমধ্যে দেখা হয় তার এলাকার এক বড় ভাইয়ের সঙ্গে। সে তাকে বাসায় নিয়ে যাওয়ার পর সব সমস্যার কথা শুনে।

আমার বউ মারা গেছে মাস ছয়েক আগে। তিন বছরের এক বাচ্চা আছে, আমার বড় বোন বর্তমানে দেখাশোনা করে। আমি একটি কোম্পানিতে চাকরি করি। তুমি যতদিন ইচ্ছা থাকতে পারো। এভাবে দুইদিন অতিবাহিত হয়ে যায়, ভাবতে থাকে গ্রামে চলে যাবে। এখানে এভাবে থাকলে মানুষ ভালো চোখে দেখবে না। কারণ এখন আবেগ কেটে বিবেকের দংশনে জ্বলছে সারাক্ষণ। আবার ভাবে বাড়িতে চলে গেলেই বা কিভাবে নিবে এই সমাজ। মানুষ কথায় কথায় খুটা দিবে। না বাড়িতে যাওয়া যাবে না। তাহলে এখানেই বা কিভাবে থাকবে। এভাবে আনমনে ভাবতে ভাবতে কখন যে মেয়েটাকে বুকে নিয়ে ঘুমিয়ে পরে তা বুঝতেই পারে না। শফিকের বড় বোন এই দৃশ্য দেখে খুবই খুশি হয়। কারণ এই মেয়েটিকে নিয়ে যত দুশ্চিন্তা। মেয়েটার এরকম একটা আশ্রয় হলে খারাপ কি। এরকম হাজারো ভাবনা ভাবছে। এদিকে পিংকি ঘুম ভেঙ্গে দেখে তার শফিকের বড় বোন অপলক দৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে আছে। এ অবস্থা দেখে পিংকি জিজ্ঞেস করে আপু কিছু বলবেন। বলছিলাম কি তুমি বড়লোক ঘরের মেয়ে আমাদের ওখানে থাকলে তারা কিছু বলবে না।

-না আমার সঙ্গে বাড়ির সবাই যোগাযোগ বন্ধ করে দিয়েছে।

-তাহলে তুমি এখন কি করবে? কোথায় যাবে?

-আপা আমি কিছু বুঝতে পারছি না কি করব।

-আমি একটা কথা বলব বলব বলে অনেক্ষণ যাবৎ ভাবছি । সাহস পাচ্ছি না।

– আপনি বলুন।

-আচ্ছা আমি যদি শফিকের জন্য তোমাকে রেখে দেই, মেয়েটিকে তোমার বুকে ঘুমাতে দেখ আমার বুকটা ভরে গেছে।

-ঠিক আছে আপু, আপনার যা ভালো মনে হয়, ব্যবস্থা করেন। আমার ফিরে যাওয়ার আর কোন পথ নেই।

মিষ্টি রোদের তেজ কখন যে বেড়ে গেছে তা বুঝতে পারেনি তিথি। তিথির স্মৃতিপটে এক এক করে ভাসতে থাকে পিংকির সঙ্গে তার ছোটবেলার স্মৃতিগুলো। মনটা খারাপ হয়ে যায় তার করুণ পরিনতির কথা ভেবে। মোবাইল ফোনটা বের করে কল লিস্টে খুজতে থাকে পিংকির মোবাইল নম্বর। কল দিতে যাবে ঠিক সেই মুহুর্তে মনে হয় এর আগে এই নম্বরে কল দিলে অন্য একজন বৃদ্ধলোক ধরেছিল এবং পিংকিকে চাইলে বলেছিল, রং নাম্বার। অবশ্যই নাম্বারটি নেওয়ার সময় যার কাছে নিয়েছিলো সে লাস্টের সংখ্যা আট না হয় চার হবে বলে সন্দেহ পূষণ করেছিলো এবং বলেছিলো নাম্বারটি লেখার সময় গাড়িতে ছিলাম বিধায় তাড়াতাড়ি লিখে নিয়েছি। তাই ভুল হবার সম্ভাবনা আছে। অনেক জল্পনা কল্পনার পরে অবশেষে চার এর জায়গায় আট দিয়ে কল দেয়। কিন্তু রিসিভ করে একজন ছেলে মানুষ।

-হ্যালো পিংকি নেই?

-পিংকি কে? তাকে আমি চিনি না। রাগে অভিমানে বলে।

-কিন্তু তিথি সেটা না বুঝতে পেরে বলে তাহলে আপনি কে?

-আমি ডাক্তার।

-কোথায় বসেন আপনি?

-আমি কোথাও বসি না, সেকেন্ড ইয়ারে পড়ি।

তিথি ভাবে ডাক্তারিতে সেকেন্ড ইয়ারে পড়ে। কেন জানি তার ভিতরে একটা রঙ্গিন স্বপ্নের ঢেউ খেলে। আসলে অনেকে বলে আমি অপরিচিত নাম্বারে কথা বলি না বা কল আসলে ধরি না। এটা আংশিক সত্য। সেটা ঘটে তার চেয়ে নিচের স্তরের কোন ফোন থেকে কল আসলে। কিন্তু কলটা যদি ডাক্তার বা ইঞ্জিনিয়ারে পড়া অথবা শেষ করা কারো কাছ থেকে আসে তখন শুধু কথায় বলে না, মিসকল দিয়ে কানটা ঝালাপালা করে ফেলতেও ভুল করে না।

রাত বারোটা ছুই ছুই, বার বার মোবাইল ফোনের দিকে তাকাচ্ছে তিথি। বারোটা বাজলেই কলরেট কম। তখন ফোন দিলে অনেক্ষণ কথা বলা যাবে।

-হ্যালো কেমন আছেন?

-কে আপনি?

– আমি তিথি সকালে আপনাকে ফোন দিয়েছিলাম ।

– ও চিনতে পারছি। তা কি ব্যাপার।

– না এমনিতেই ভাবলাম আপনার সঙ্গে কথা বলি। তা কি করছেন?

– পড়াশুনা।

– এত রাত পর্যন্ত?

– এত রাত কোথায়? আমি প্রায় বারোটা একটা পর্যন্ত পড়াশুনা করি।

রোজ এভাবে ঘন্টার পর ঘন্টা কথা চলতে থাকে এবং এক পর্যায়ে তাদের মধ্যে গভীর সম্পর্ক গড়ে উঠে। তিথিকে বারবার বুঝাতে চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয় রকিবুল হাসান ডাক্তার। সে আসলে মেডিক্যাল এ পড়া ডাক্তার নয়।তার দাদা স্বপ্ন ছিল নাতীকে ডাক্তার বানাবে। তাইতো ছোট থেকেই আদর করে তাকে ডাক্তার ডাকতো। আস্তে আস্তে এই নামটিই সবার মুখে মুখে প্রচলন হয়ে যায়। তার জীবনের সমস্ত ঘটনা শুনার পরেও তাকে বিয়ে করে তিথি। প্রতিজ্ঞা করে যে ডাক্তার শব্দের প্রতি দুর্বল হয়ে তার সাথে জরিয়েছি। সেই শব্দটি অবশ্যই তাকে দিয়েই বাস্তবায়ন করব। আর না হলেও অসুবিধা হবে না। সে একজন ভালো মানুষ। তাকে নিয়ে অবশ্যই সুখে শান্তিতে জীবনটা পার করতে করতে পারবো।

এদিকে এই খবর তিথির বাবা মার কাছে পৌছলে তাকে বাসা থেকে বের করে দেয়। অবশেষে রকিবকে নিয়ে চলে আসে শহরে। একটা কোম্পানীতে চাকরী নেয় তিথি। কোচিং এ ভর্তি করে রকিবকে। এবং সত্যি সত্যি মেডিক্যালে চান্স হয়ে যায় রকিবের।

সুজলা সুফলা শস্যশ্যামলা গ্রামটির নাম শিমুলতলী। এই গ্রামে এখন সবই আছে, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, বাজার, ছোট ছোট শিল্প কারখানা। শুধু নেই কোন চিকিৎসা ব্যবস্থা। তাই তিথি রকিবকে নিয়ে তার নিজ গ্রামে এসে একটি ক্লিনিক স্থাপন করে। যেখানে গ্রামের সাধারণ মানুষকে চিকিৎসা সেবার পাশাপাশি বিভিন্ন সামাজিক কর্মকান্ড সম্পর্কে গ্রামবাসীকে সচেতন করার কাজ করে।

আজ শিমুলতলী গ্রাম যেন চির শান্তির একটি গ্রাম। কি নেই এখানে। মধ্যরাতেও যদি কারও সমস্যা হয় দৌড়ে যায় ক্লিনিকে। ডাঃ রকিবও সকল আরাম, আয়েশ ত্যাগ করে সেবা দিতে থাকে গ্রামবাসীকে। আজকে আর সেই রকিবুল হাসান ডাক্তার আগের মত বোকা নেই। ডাক্তার নামটি আজ আর নামের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। সার্ভিসের দিকেও অর্জন করেছে। তিথি অক্লান্ত আজ সাইনবোর্ডে তার নাম শোভা পায় ডাঃ মোঃ রকিবুল হাসান ডাক্তার। দাদার স্বপ্নের নামটি বাদ যায় নি। অনেক রাত পর্যন্ত এসব স্মৃতিচারণ করে যেইমাত্র একটু ঘুমিয়েছে, ঠিক তখনি বাড়ির বাহিরে থেকে কান্নার শব্দ ভেসে আসে। ডাক্তার সাব আমার স্ত্রীকে বাচাঁন। উঠে দৌড়ে ক্লিনিকের দরজা খুলে ভিতরে নিয়ে যায়। কান্নার শব্দ শুনে তিথিরও ঘুম ভেঙ্গে যায়। ঘুম থেকে উঠে তার পিছে পিছে ক্লিনিকে যায়। ক্লিনিকে ঢুকে দুজনই আশ্চর্য হয়ে যায়। একি পিংকি, তোমার একি অবস্থা। তার স্বামী বলতে থাকে, ঢাকা থেকে বাড়ি আসছিলাম, কাছাকাছি আসলে আমাদের সিএনজির সঙ্গে একটি মটরসাইকেলের মুখোমুখি সংঘর্ষে আমার স্ত্রীর এ অবস্থা হয়েছে। ডাক্তার প্রাণপণ চেষ্টা করে তাকে বাঁচাতে। অনেক্ষণ পরে পিংকির জ্ঞান ফিরে আসলে চোখ খোলে তাকিয়ে দেখে রকিব ডাক্তার। তাকে একদিন অবহেলা করে অধিক সুখের আশায় চলে গিয়েছিল। দু চোখ দিয়ে অঝোরে ঝড়তে তাকে অশ্রু। রাত প্রায় শেষের দিকে, মসজিদ থেকে আযানের ধ্বনি ভেসে আসছে। নামাজে যাওয়ার প্রস্তুতি নিবে ঠিক সেই সময় জোড়ে জোড়ে শ্বাস-প্রশ্বাস নিতে থাকে পিংকি। তার কপালে হাত রাখতেই দু-চোখ দিয়ে টপ টপ করে অশ্রু ঝড়তে থাকে, আর বাকীরা বুঝতে না পারলেও ডাক্তার বুঝতে পারে, পিংকি এই বুঝি সবাইকে ফাকি দিয়ে পৃথিবী থেকে বিদায় নিচ্ছে। আস্থে আস্থে তার চোখের পাতা দুটি দুহাতে বন্ধ করে দিয়ে মাথা পর্যন্ত সাদা কাপড় উঠাতে গিয়ে মনের অজান্তেই ডাঃ রকিবের চোখ বেয়ে ঝড়ে পড়ে ক-ফুটা অশ্রু।

add 1


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

অন্যান্য লেখা সমূহ

আজকের দিন-তারিখ

  • বৃহস্পতিবার (সকাল ৬:১০)
  • ২২ ফেব্রুয়ারি, ২০২৪
  • ১১ শাবান, ১৪৪৫
  • ৯ ফাল্গুন, ১৪৩০ (বসন্তকাল)
Raytahost Facebook Sharing Powered By : Sundarban IT