• আজ- সোমবার, ২০ মে ২০২৪, ০৭:২২ অপরাহ্ন
Logo

বনকপোত

সাজ্জাদ ফাহাদ / ৩১৬ বার দেখা হয়েছে
আপডেট : সোমবার, ২২ জানুয়ারি, ২০২৪

add 1
  • সাজ্জাদ ফাহাদ

সাদা মেঘের খণ্ড গুলো উত্তরের আকাশ থেকে দক্ষিণের আকাশে যাচ্ছে। গাছের পাতা গুলো হাওয়ায় হাওয়ায় দুলছে ; কিছুক্ষণ পর দেখা গেলো পশ্চিম আকাশের সাদা মেঘের গুচ্ছ পুবের আকাশে যাচ্ছে। স্মৃতির ইচ্ছে করছে সাদা মেঘের মতো আকশে আকাশে ঘুরতে। সে এক মনে আকাশ-মেঘ-মেঘের গুচ্ছ-এদের দিকে তাকিয়ে আছে। এক জোড়া পাখি তখন পুবের আকাশ থেকে পশ্চিমের আকাশে উড়ে গেলো।
ছাদের ওপর এক ভদ্রলোক বসে পত্রিকা পড়ছেন। আজ কাল মানুষ পত্রিকা পড়তে চায় না। পত্রিকায় একদিন আগের তথ্য দেয়া থাকে আর টেলিভিশনে ঘণ্টার খবর ঘণ্টায় পাওয়া যায়। তার থেকে দ্রুত মাধ্যম হলো ফেসবুক, টুইটার এগুলো ; সেখানে প্রতি মিনিটের খবর মিনিটে পাওয়া যায়। ভদ্রলোক দীর্ঘক্ষণ পত্রিকা নিয়ে বসে ছিলেন। এবার ওঠে দাঁড়ালেন৷ হাই তুলতে তুলতে ছাদের কর্ণারে যেয়ে প্যারাপেডের ( ছাদের উপরে চারপাশ ঘিরে যে দেওয়াল থাকে তার উপরের অংশ) ওপর হাত রেখে দাঁড়ালেন। ভদ্রলোকের বয়স পয়ষট্টির মতো হবে। ভদ্রলোক একজন কথা সাহিত্যিক। আজকের পত্রিকায় তিনি একটা শিরোনাম লিখেছেন। শিরোনামের নাম, ‘ তারকা হওয়ার নেশায় কাটছে বিষাদে শৈশব।’ এ নিয়ে তিনি একটা গল্প ও লিখছেন। গল্পের শিরোনাম দিয়েছেন, ‘ হেমলকের মতো শৈশব। ‘ ভদ্রলোকের নাম রাফিউজ্জামান৷

‘ কোথায় যাচ্ছিস?’
‘ ভার্সিটিতে। ‘
‘ এতো রাগ দেখিয়ে কথা বলছিস কেনো?’
স্মৃতি কোনো কথা বললো না৷ চুপ চাপ বেরিয়ে গেলো। রাফিউজ্জামান লেখালেখিতে বসলেন। তিনি নিয়ত করেছেন আর কোনো গল্প-উপন্যাস লিখবেন না। এখন তার একটা আত্মজীবনী লিখবেন আর মাঝে মাঝে মনের আনন্দ কিংবা বেদনায় লিখবেন কিছু কবিতা৷ তিনি কী-বোর্ড চেপে গটগট করে লিখলেন :
গাছের পাতা দুলে প্রাকৃতিক বাতাসে আর মানুষের জীবন দুলে মানুষের বাতাসে। মানুষ মানুষের বাতাস পেলে বিবেক অন্ধ হয়ে যায় আর কেউ যদি সে বাতাস পেয়েও নিজেকে গুছিয়ে রাখতে পারে তবে সে বিবেকানন্দ হয়ে যায়। আমি জীবনে বিবেক অন্ধ ও হইনি আবার বিবেকানন্দ ও হইনি। তবে কি হয়েছি আমি! আমি হয়েছি এক ব্যর্থ প্রেমিক, ব্যর্থ স্বামী, ব্যর্থ পিতা, একজন ব্যর্থ কথাসাহিত্যিক, এক ব্যর্থ কাব্যের চরণ। জীবনে আমাকে মনে রাখার মতো কারো দেখা পেলাম না৷ আমাকে আমার মেয়েও মনে রাখবে না৷ তার ধারণা আমি তার জন্য কিছুই করিনি। সে আমাকে বারবার কারণে অকারণে ভুল বুঝে গেছে৷ আমিও সে ভুল ভাঙাবান চেষ্টা করিনি। একদিন সে সব কিছু বুঝতে পারবে। আর আমাকে খুঁজবে৷ সে আমাকে খুঁজবে খুঁজবে কিন্তু পাবে না৷ আমি সাদা মেঘের সাথে মিশে যাবো ৷ সেখানে বসে লিখবো :
জগতে বুঝনি মোরে
এখন খুঁজও কোন তাড়নায়
আমি তো ছিলাম ব্যর্থ পিতা
তবে কাঁদো কোন বেদনায়!
এখন আর কেঁদোনা স্মৃতি
আমার স্মৃতি যাও ভুলে
আছি খুবই সুখে
জগতে বুঝনি আমায়
এখন কেনো বুঝো আর কেনো
থাকো দুঃখে!

সন্ধ্যায় স্মৃতি এক তাগড়া যুবককে বাসায় নিয়ে আসে। রাফিউজ্জামান তখনো লেখালেখি করছিলেন। হাসির আওয়াজে তিনি ঘুরে তাকালেন। কিছু বলতে চেয়েও বললেন না। স্মৃতি ছেলেটাকে নিয়ে ওপরের ঘরে চলে গেলো। তারা ভিতরে ঢুকে ঘরের দরজা আটকে দেয়। রাফিউজ্জামান ওঠে যেয়ে দরজায় কান পাতলেন। ভেতর থেকে মিটির মিটির হাসির ওয়াজ বেরোচ্ছে৷ রাফিউজ্জামান দাঁত কামড়ে ধরলেন। তার মাথায় রক্ত ওঠার মতো অবস্থা। দরজা ধাক্কে স্মৃতিকে ডাকতে যেয়েও তিনি ডাকলেন না। নিরব হয়ে বসার ঘরে যেয়ে বসলেন।
আজ রাফিউজ্জামানের বাসায় তার এক পুরনো বন্ধুর আসার কথা ছিল কিন্তু আসেনি। হয়তো আগামীকাল আসবেন৷ রাফিউজ্জামান তার বন্ধুকে দু’বার কল করলেন কিন্তু কল রিসিভ হয়নি। তার বন্ধু রশিদ আহমদ। তাদের বন্ধুত্ব কলেজ লাইফ থেকে৷ কলেজ শেষে বিশ্ববিদ্যালয়ের হলে তারা একই রুমে ছিলেন। মাস্টার্স শেষে পিএইচডি করার জন্য রশিদ চলে গেলেন লন্ডনে আর রাফিউজ্জামান দেশেই একটা বিশ্ববিদ্যালয়ে রসায়ন বিভাগের প্রভাষক হিসাবে নিয়োগ দেন। তাদের দু’জনের আজ বহু দিন পরে দেখা হবার কথা ছিল। বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইফে তাদের অনেক স্মৃতি রয়েছে। বন্ধু রশিদের স্মৃতিকথা নিয়ে তিনি একটা বই প্রকাশ করেছেন দু’বছর আগের বই মেলায়। রশিদের সাথে তার শেষবার দেখা হয়েছিল এয়ারপোর্টের গেটে তারপর আজ দেখা হবার কথা ছিল কিন্তু দেখা হলো না। শেষবারের দেখায় রশিদ তাকে একটা নোটবুক দিয়েছিলো। তিনি সেই নোটবুকে তার গোপনীয় কথা গুলো লিখে রাখেন। যেসব কথা কারো কাছে বলা যায় না সেগুলো। স্মৃতি লুকিয়ে মাঝে মাঝে তার ড্রয়ার থেকে সেই নোটবুকটা বের করে। সে কোনো লেখা পড়েনা৷ নোটবুক বের করে তার উপর মুখ ভরে থু দেয়। তারপর যায়গা মতো রেখে দিয়ে লুকিয়ে বেরিয়ে পরে।

স্মৃতির লেখা
কথাসাহিত্যিক রেদোয়ান মাসুদ বাবাকে নিয়ে লিখেছেন, ”বাবা হলেন একটি বাড়ির ছাদ, যে নিজে পুড়ে সন্তানদের ছায়া দেয়, কিন্তু মুখ ফুটে কিছু বলে না।” ফ্যানি ফার্ন বলেছেন, ”মেয়েদের কাছে বাবার মানেই ভালোবাসার আরেক নাম।” প্রবাদে আছে, ”প্রত্যেক অসাধারণ মেয়ের পিছনেই একজন অসাধারণ বাবা রয়েছেন।” আরো অনেকে অনেক কথা বলে গেছেন, অনেকে বলছেন। এসব আমার কাছে নিতান্তই ফালতু কথা মনে হয়৷ সাহিত্যিকরা লেখার সৌন্দর্য বৃদ্ধির জন্য অনেক ফালতু কথাও বলে থাকেন। সে জন্য তাদের সব কথাকে মহৎ বলে গণ্য করা ঠিক না।
আমি এ বছর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জিওগ্রাফির দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্রী। আমার কোনো ভাই বোন নেই। আমি একা। ক্লাস সিক্স থেকে টেন পর্যন্ত রোল এক থেকে বদল হয়নি। ক্লাস নাইনে একবার ফারুক স্যার দু’নাম্বারি করে জসীম স্যারের মেয়েকে রোল এক দিতে চেয়েছিলেন কিন্তু সেটা ব্যর্থ হয়েছিল ছোট মামার কারণে। বড়ো বড়ো লোকেদের সাথে তার ওঠা-বসা। প্রতি মাসে দু’বার করে তাকে পুলিশ গ্রেফতার করে কিন্তু রাখতে পারেনা। ঘণ্টাখানিকের মাথায় আবার বেরিয়ে আসে। তার কাছে গ্রেফতার এবং ছাড়া পাওয়ার বিষয়টা হলো পেনসিলের লেখার মতো। একজনের নির্দেশে তাকে গ্রেফতার করা হয় তো আরেক জনের ওয়ার্ডার মতো তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়। তিনি থানায় জান আর আসেন, কি এমন মহৎ কাজ যে তিনি করে ফেলেন! থানা থেকে প্রতিবার বাড়ি ফিরে গলায় ফুলের তোড়া নিয়ে। তারপর এসএসসি পরীক্ষায় গোল্ডেন পেয়েছি, ইন্টারে লালমাটিয়া মহিলা কলেজ থেকে জিপিএ ফাইভ পেয়েছি, দিন-রাত পড়াশোনা করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে চান্স পেলাম। লালমাটিয়ায় আমার সব থেকে কাছের ফ্রেন্ড ছিলো দিপালী , সেও একই রেজাল্ট করেছে। কিন্তু রেজাল্ট আসার পর ওর বাবা-মা দু’জনে ওকে সাপটে ধরে কেঁদেছিল। আমি দূর থেকে তাদেরকে দেখছিলাম। সেদিন আমারও কেমন চোখ ভিজে ওঠেছিল ওদের আনন্দ দেখে। আমারও ইচ্ছা হয়েছিল বাবাকে সেদিন সাপটে ধরে কাঁদার জন্য। আমি সারাক্ষণ অপেক্ষাতে ছিলাম বাবাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদার জন্য। দুপুরের আগ মূহুর্তে রেজাল্ট পেলাম, দুপুর পেরোলো, বিকাল পেরোলো, সন্ধ্যা পেরিয়ে রাত চলে এলো ; আমি কলেজ মাঠেই অপেক্ষা করছিলাম। এর মাঝে তাকে কয়েকবার কলও দিয়েছিলাম কিন্তু তিনি কল ধরেননি। আমি ভেবেছিলাম বাবা আসবে কিন্তু আসেনি। রাতে বাসায় ফিরে নিজেই বাবার রুমের দরজায় দাঁড়িয়ে বাবাকে ডাকলাম রেজাল্টের কথা বলার জন্য। দু-তিনবার ডাকার পর তিনি সারা দিলেন ; রেজাল্ট বললাম। তিনি কোনো পাত্তা দিলেন না। তার ঘরে তখন মায়রা নামের এক বদমাশ মহিলা ছিল। আমি দরজার বাহিরে থেকে তাদের ফিসফিস কথা শুনছিলাম। আমি সেদিন রাতে খুব ভেঙে পরেছিলাম, খাবার না খেয়েই ঘরের দরজা আটকে রাত ভরে কেঁদেছি। কান্নার আওয়াজ থামিয়ে রাখতে না পেরে আওয়াজ করেই কেঁদেছি কিন্তু বাবা তখন একবারের জন্যও আমার ঘরে আসেনি।
ভার্সিটি থেকে ফেরার পথে নাবিলকে আমি মাঝে মাঝেই বাসায় নিয়ে আসি। প্রায় সময় এসেই দেখি বাবা লেখালেখি করছেন। তিনি আসলে কি লিখেন আমি জানিনা। তার লেখার রঙ-ঢং-রস সম্পর্কে আমার কোনো ধারণা নেই। শুনেছি তার নাকি অনেক গুলা বই ছাপা হয়েছে। আমি সেগুলোর নামও জানিনা। জানার আগ্রহও নেই, কখনো হবেও না। ভার্সিটিতে অনেকে আমার সাথে তার বিষয়ে আলাপ করতে আসে, তাতে যথেষ্ট বিরক্ত হই। তার লেখা পড়বো দূরের কথা, তার নাম শোনলে কিংবা বাসায় ফিরে তাকে দেখলেই আমার ভেতর থেকে তার জন্য ঘৃণা আসে। রাফিউজ্জামান এক সময় আমাকে পাত্তা না দিলেও এখন সে আমার সাথে কথা বলার জন্য বিভিন্ন ইস্যু খুঁজে বেরায়। নাবিলকে সে পছন্দ করে না ; এটা আমি খুব ভালো করেই টের পাই। নাবিল আমার ঘরে ঢুকলে সে দরজায় এসে কান পেতে রাখে। তবে নাবিল তাকে পছন্দ করে সেটা আমি বুঝতে পারি। সে জন্য আমি তার ওপর খুব বিরক্ত হই ; তবে কেনো পছন্দ করে সেটা কখনো জিজ্ঞেস করিনি। ইচ্ছে করে না। সে হয়তো তাকে তার লেখার জন্য পছন্দ করে। আবার হতে পারে সে রাফিউজ্জামানের সম্পর্কে তেমন কিছুই জানেনা তাই পছন্দ করে। যখন আমি রাফিউজ্জামানের সব কিছু তার কাছে ওপেন করে দেবো তখন আর রাফিউজ্জামানের প্রতি তার ভালো লাগা কাজ করবে না। কারও কাছে যখন অন্যের সব কিছু ওপেন হয়ে যায় তখন আর তার প্রতি শুরুর দিকের শ্রদ্ধাটা থাকেনা। আমার সাথে এমন একটা ঘটনা ঘটেছিল রবী ঠাকুরকে নিয়ে। ছোটো বেলায় ঠাকুরের লেখা বুঝতে পারতাম না। কিন্তু পাঠ্য বইয়ে প্রতি ক্লাসেই তার একটা করে কবিতা পেতাম। তাতে খুব অতিষ্ঠ হতাম। ইন্টারে পড়ার সময় রবী ঠাকুরের ‘সোনার তরী’ কবিতা পড়ে তার প্রতি আমার শ্রদ্ধা জন্মেছিল। কিন্তু পরে যখন জানতে পারলাম সে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের বিরোধীতা করেছিল তখন তার প্রতি আমার সব শ্রদ্ধা ওঠে যায়। তবে রবীন্দ্রনাথের জাতীয় সংগীত আর রবীন্দ্র সংগীত গুলো আমার হৃদয় স্পর্শ করে।
‘ আজি ঝরো ঝরো মুখর বাদরদিনে
জানি নে, জানি নে কিছুতে কেন যে মন লাগে না ॥

এই চঞ্চল সজল পবন-বেগে উদ্‌ভ্রান্ত মেঘে মন চায়
মন চায় ওই বলাকার পথখানি নিতে চিনে॥…’

নাবিল আমাকে অসম্ভব রকমের ভালোবাসে৷ তবে তার প্রতি আমার কোনো ভালোবাসা নেই। আমার পছন্দ রাফিউজ্জামানের এক হাবাগোবা ছাত্রকে। ছাত্রের নাম হুমায়ুন । হুমায়ুনকে বাবা খুব পছন্দ করে। বাবা চায় আমি তার ভক্ত ছাত্র হুমায়ুনকে নিয়ে আমার ঘরে যাই। আমি যাতে হুমায়ুনকে বিয়ে করি। কিন্তু তার চাওয়া যাতে পূর্ণ না হয় সেজন্যই আমি মাঝে মাঝে নাবিলকে নিয়ে আসি। তিনি যখন আমার সামনে দিয়ে মায়রা রহমানকে নিয়ে তার ঘরে যেতেন তখন আমার যেমন ফিল হতো এখন বোধ হয় তারও তেমনটাই ফিল হয়। নাবিল আমার ঘরে ঢুলকেই আমি দরজা আটকে দেই। তাতে রাফিউজ্জামান কি ভাবে জানিনা, হয়তো ভাবে আমি নাবিলের সামনে নগ্ন হয়ে বসে থাকি আর নাবিল আমার নগ্ন পেইন্টিং করছে, সে আমার দেহের ওপর…। তবে এসব কিছুই না, সে আমার এসাইনমেন্ট করে দেয় ৷ আমি রাফিউজ্জামানকে কষ্ট দেবার জন্য নাবিলকে নিয়ে আসি । দরজ আটকে লেখার ফাঁকে ফাঁকে তার সাথে ফিসফিস করে কথা বলি যেমন করে রাফিউজ্জামান বলতো মায়রা রহমানের সাথে।

হুমায়ুনকে বাবা হাবাগোবা মনে করলেও সে হাবাগোবা নয়। আমি যখন ভার্সিটি থেকে বাসায় ফিরবো তার পনেরো-বিশ মিনিট আগে সে আমাদের বাসায় আসে। রাফিউজ্জামান মনে করে হুমায়ুন তার জন্য আসে। কিন্তু আসলে সে আসে আমার নেশায়, আমাকে দেখতে আসে। শিক্ষককে ছাত্রের প্রতিদিন প্রয়োজন পরেনা। শিক্ষক তার ছাত্রকে একদিন যা শিক্ষা দেয় তা দিয়ে ছাত্র বহুদিন পারি দিতে পারে। অথচ সে আমাদের বাসায় নিয়মিত আসে। তার মানে তার প্রয়োজন রাফিউজ্জামানকে নয়, স্মৃতিকে। হুমায়ুন লুকিয়ে একদিন আমার ঘরে ঢুকেছিল, তারপর আমার টেবিলের ওপর একটা চিঠি রেখে বেরিয়ে পরে৷ চিঠিতে কোনো নাম-ঠিকানা ছিল না। তবে আমি বুঝতে পেরেছি এটা হুমায়ুনের কাজ। শিক্ষকের মেয়ের প্রতি ছাত্রদের একটা তীব্র আকর্ষণ কাজ করে। ছাত্র জীবনের সফলতা বলতে ছাত্রতা মনে করে শিক্ষকের মেয়ের সাথে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে তুলা।

সারাদিন আমার কেমন অস্থির অস্থির লাগে। ইচ্ছা করে এই শহরের সব বিল্ডিং গুলোতে আগুন জ্বালিয়ে দিতে, সব মানুষ মেরে ফেলতে, রাফিজ্জামানকে খুন করতে। অস্থির হয়ে দৌড়ে ছাদে চলে গেলাম। আকাশের দিকে তাকিয়ে দেখলাম দু’টি পাখি পশ্চিমের আকাশ থেকে পুবের আকাশে উড়ে যাচ্ছে।
হুমায়ুন তার হাতে করে একটা বই নিয়ে এসে আমাকে বলল :
‘ স্যার আপনাকে এই বইটি পড়তে বলেছেন।’
‘ কিসের বই এটা ?’
‘ স্যারের জীবনের সব অভিজ্ঞতা থেকে লেখা, স্যারের আত্মজীবনী। ‘
‘ আত্মজীবনী সত্যি হয় না, এতে সবাই গুণ লেখে পৃষ্ঠা পুরায়, দোষ লেখে না। ‘
হুমায়ুন কিছুক্ষণ আমার দিকে চেয়ে থেকে চলে যায়। তার স্যার তাকে আর আমার কাছে পাঠায়নি। আমার চোখ দু’টো পদ্মের মতো লাল হয়ে ওঠেছে, পানি টলটল করছে। আমি জবা ফুল গাছটার দিকে তাকিয়ে দেখলাম বনকপোত এসে আমার জবা ফুল গাছের ওপর বসেছে৷

আত্মজীবনীর লেখা
সেভেন্টি সিক্স-এ আমার সাথে একজনের পরিচয় হয়। ট্রেনে করে আমরা সিলেটে যাচ্ছিলাম। তখন এতো বয়স ছিল না। এই আঠারো-উনিশের মতো হবে। কলেজে পড়ি। আমি সহ আমরা তিনজন ছিলাম। আমি,রশিদ আর রঞ্জন। রঞ্জন ছিল হিন্দু, ভালো গান গাইতো। কলকাতায় বাড়ি, থাকতো বাংলাদেশে। তো আমরা ট্রেনের কেবিনে বসে গান করছিলাম। রঞ্জন গান গাইছে, রশিদের হাতে গিটার আর আমার হাতে খঞ্জরি। গান গাইলে তো আর কেবিনের মধ্যেই কেবল আওয়াজটা থেমে থাকে না৷ বাহিরেও আওয়াজ বেরোচ্ছিল। কারো ভালো লাগছিল আবার কেউ বিরক্ত হচ্ছিল। ট্রেনে থাকেনা, নানান স্বভাবের মানুষ। তো পাশের কেবিন থেকে মোটাসোটা একজন মাস্তান টাইপের লোক বেরিয়ে আসে। গলায় রুপার মোটা চেইন, হাতে চার-পাঁচটা ব্যাসলাইট, দশ আঙ্গুলে দশটা আংটি পরা, পরনে লাল গেঞ্জি। লোকটা এসে আমাদের কেবিনের দরজায় নক করে। আমি যেয়ে দরজা খুললাম। লোকটা তার পকেট থেকে একটা ছুরি বের করে আমাদের দেখিয়ে বলল, ”আর একটা আওয়াজ গেলে গলার ধুর ছিড়া ফেলামু।” রঞ্জন ভয়ে কাপতে থাকে। দরজা লাগিয়ে তাকে আবার গান ধরতে বললাম। কিন্তু তাকে দিয়ে আর গান গাওয়ানো যাচ্ছে না৷ কিছুক্ষণ পর আবার দরজায় নক করলো। রঞ্জন তো ভয়ে অস্থির, রশিদ তাকে সামলানোর চেষ্টা করছে, আমি যেয়ে দরজা খুললাম। দেখলাম একটা মেয়ে! ট্রেনে তার সাথে পরিচয় হলো, তার নাম নীলু।
নীলু রঞ্জনকে গান গাইতে বলে। সে স্বাভাবিক হয়ে গান ধরলো। মেয়েটা আমার হাত থেকে খঞ্জরি নিয়ে বাজাতে লাগালো। নারীর অনুপ্রেরণা ভিরু পুরুষকেও যে দাঁড় করাতে পারে সেদিন ট্রেনে তার প্রত্যক্ষদর্শী হলাম। নীলু এখন ট্রমা হাসপাতালে চেম্বার বসিয়েছে। বয়সে সে আমার থেকে তিন-চার বছরের বড়ো হবে৷ তবে সে আমার কাছে সব সময় তার বয়স কমিয়ে রাখে, বুড়ো বয়সে এসেও নিজেকে কিশোরী প্রমাণ করতে চায় ; খারাপ-কে বলে পচা । স্মৃতির জন্মের সময় নীলু-ই সুস্মিতাকে ডেলিভারি করিয়েছে। তার জন্যই হয়তো স্মৃতির চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য কিছুটা নীলুর মতো হয়েছে, পুরুষ পাগল।
আজ কাল স্মৃতি একটা বদমাশ ছেলেকে বাসায় নিয়ে আসে। বুয়ার থেকে যেটুকু শুনেছি তাতে সে ছেলের নাম নাবিল। তারা দু’জন ওপরের ঘরে গিয়ে দরজা আটকে দেয়। ভেতরে তারা দু’জন ফিসফিস করে কথা বলে। কথাগুলো ঠিক বুঝা যায় না, তবে মাঝে মাঝে যেনো আমি শুনতে পাই স্মৃতি তাকে বলছে- শক্ত করে চেপে ধরো, আমার ওপরে ওঠ…। একবার মনে হয় স্মৃতি এসব নোংরা কাজ করবে না৷ আবার মনে হয়, এখন-ই তো তার এসব বড়ো রকমের ভুল করার বয়স। এ বয়সেই মানুষ তার জীবনের সব থেকে বড়ো ভুল গুলো করে থাকে, তার সে ভুলের বোঝা বয়ে যায় আজীবন৷ যৌবনে ভুল সবাই করে। অনেকের ভুল প্রকাশ পায়, অনেকের গুলো চাপা পরে যায়। তবে সবাই তার ভুল গুলোকে সব সময় চাপা রাখতে চায় কিন্তু স্মৃতি তার ভুল গুলো সবার সামনে ফুটিয়ে তুলছে। বিশেষ করে আমার সামনে। আমার সামনে তার এসব ভুল ফুটিয়ে তুলে সে আত্মতৃপ্তি অনুভব করে। সে আমাকে পছন্দ করে না। এ অপছন্দ করার পেছনে বড়ো ধরনের একটা ভুল-বোঝাবুঝি আছে। স্মৃতির কাছে আছে একটা লম্বা হিস্টোরি। সে হিস্টোরির লম্পট ব্যক্তিটা হলো- রাফিউজ্জামান।

বহুদিন পর আমার বন্ধু রশিদ-এর সাথে দেখা হবার কথা ছিলো। কিন্তু সে আসবে বলেও আসলো না ৷ সেদিন দু’বার কল দিয়ে পাইনি, ভেবেছিলাম কোনো কাজে আটকা পরেছে ; পরে হয়তো কল ব্যাক করবে। কই! আর কল ব্যাক করল না। রশিদের সাথে দেখা হলে প্রাণ খুলে কিছু কথা বলা যেতো। কথা বলার মতো মানুষ খুঁজে পাইনা। এই ব্যস্ত শহর, কে-ই বা কার আপন! বাহিরে বেরিয়ে নিজ থেকে কারো সাথে দু’কথা বলতে গেলে লোকে খুব সস্তা মনে করে, তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করে নানান কথা বলে ফেলে। বাসায় এসে কথা বলবো! স্মৃতিকে ছাড়া আর কেউই নেই। তাকে আর পাই কই! আগে মাঝে মাঝে আমার এক ছাত্রের মা বাসায় আসতো। ভদ্রমহিলার নাম ছিল মায়রা রহমান। তার স্বামী ছিল না। আমরা যখন আমার ঘরে যেয়ে কথা বলতাম তখন স্মৃতি মনে করতো আমরা নিসিদ্ধ খেলায় মেতে ওঠেছি। সারাদিন কাজকর্ম শেষে বাসায় ফিরে যখন কারো সাথে প্রাণ খুলে কথা বলা যায় না তখন দম বন্ধ হয়ে আসে। তাই মাঝে মাঝে মায়রা রহমান আসলে আমি তাকে সহজে যেতে দিতাম না। স্মৃতি মায়রা রহমানকে সহ্য করতে পারতো না। তার ধারণা ছিল মায়রা রহমানের সাথে আমার নষ্ট সম্পর্ক আছে। সে সম্পর্কে প্রধান বাঁধা ছিল তার মা। বাঁধা দূর করতেই আমি তার মা-কে ডিভোর্স দিয়েছি। কিন্তু বাস্তবিক অর্থে গল্পটা এমন ছিল না।

আমার সঙ্গে তার যখন বিয়ে হয়েছে সে তখন ক্লাস টেনে পড়ে। ১৪ বৈশাখ আমার ঘরে আসে কুসুম কোমল এক কিশোরী। সুস্মিতা ছিল আমার স্বপ্নে গড়া স্বপ্ন। আমরা ভালোবেসে বিয়ে করি। বিয়ের আগে দু’বছরের সম্পর্ক। আমি তখন অনার্স থার্ড এয়ার-এ পড়ি। একদিন রাত দশটায় সে আমাকে বলল তাদের ধানমন্ডির বাসার সামনে এসে তার সাথে দেখা করতে। তখন মাইনুল ছিল আমার সাথে। আমি তার মোটরসাইকেল নিয়ে চলে গেলাম সুস্মিতাদের বাসার সামনে। যেয়ে দেখি কদমফুলের মতো একটা মেয়ে গেটের সামনে দাঁড়িয়ে আমার অপেক্ষার প্রহর গুনছে। তাকে কেমন অস্বাভাবিক দেখাচ্ছিল। আমি মোটরসাইকেল থেকে নামতেই সে আমাকে সাপটে ধরে কাঁদতে লাগলো। তার সেদিনের কান্না এখনো আমার মনে আঁচড় কাটে। আমি তাকে নিয়ে ধানমন্ডি লেকের কর্ণারে যেয়ে বসি। সে বাসা থেকে না বলে বেরিয়েছে। বাসায় তার বিয়ের কথা চলছে তাই সে পালিয়ে এসেছে। আমি কি করবো বুঝতে পারছি না। পকেটেও টাকা পয়সা নেই যে তাকে নিয়ে দূর কোথাও চলে যাবো। তখন আজমতউল্লাহ্ স্যারের সাথে আমার বন্ধুসুলভ ছিল। স্যারকে কল দিয়ে বললাম কিছু টাকা লাগবে।
স্যার দু’বিয়ে করেছে। ঢাকা শহরে দুইটা পরিবার চালানো সোজা কথা নয়। স্যারের পকেট প্রায় সময়েই শূন্য থাকে। সেদিন কিভাবে যেনো টাকা ছিল। চাওয়া মাত্রই পাঠিয়ে দিলো। রশিদ, রঞ্জন, মাইনুলকে কল দিয়ে উত্তরা কাজি অফিসে আসতে বললাম। কিছুক্ষণ পর তারা এসে পৌছাল। অবাক হলাম আজমতউল্লাহ্ স্যারকে দেখে, তিনিও ওদের সাথে এসেছেন। স্যার আসাতে ভালোই হয়েছে। স্যারকে দিয়ে বিয়ের উকিল দেওয়ানো গেছে। নাহয় বন্ধুদের মধ্য থেকেই একজনকে বাপ ডাকা লাগতো। সেদিন রাতে আর বাসায় ফিরিনি। সুস্মিতাকে নিয়ে স্যারের বাসায় গেলাম। সেখানেই আমাদের বাসর হয়। সবার মতো আমাদের বাসর ঘর ফুলসজ্জার ছিল না। বাসর ঘরের সৌন্দর্য বলতে ছিল একটা ইলিক্ট্রিক নীল রঙে ড্রিম লাইট।
ছিল না চাকরি-বাকরি, নিজেই পকেট খরচা চালাই বাবার টাকা দিয়ে৷ বিয়েও করে ফেললাম পরিবারের কাউকে না জানিয়ে। তার ওপর দিয়ে আবার সুস্মিতাকে না পেয়ে তার পরিবারের লোকজন নিখুঁজ ডায়েরি করেছে, ধানমন্ডি থানায় আমার নামে মামলা দিয়েছে। মেয়ে প্রাপ্তবয়স্ক না হওয়াতে আরো বেশি ঝামেলায় পরেছি। সুস্মিতার কেমন আত্মিয় যেনো পুলিশে চাকরি করে, সেও লেগেছে আমার পেছনে। কি করবো বোঝতে পারছিলাম না। স্যার আমার পরিস্থিতিটা বুঝতে পারছিলেন, তারপর তিনিই একদিন আমাদের বাসায় যেয়ে আব্বা-আম্মাকে রাজি করালেন। আমি সুস্মিতাকে নিয়ে আমাদের বাসায় ফিরি। অনেক আইনি ঝামেলা পারি দিয়ে সব কিছু স্বাভাবিক হয়েছে। আইনি ঝামেলার মধ্য দিয়ে সুস্মিতা কোর্টের কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে আমার পক্ষে কথা বলেছে, সে আমার বিপদের মূহুর্তে আমার পাশে ছিল কিন্তু আমার ভালো একটা মূহুর্তে সে আমাকে ছেড়ে গেছে। কোনো কারণ ছাড়াই সে আমাকে ছেড়ে গেছে অথচ যাওয়ার পর অনেক কারণ দেখিয়েছে। যে কারণ গুলো থেকে যাওয়ার ইচ্ছা থাকলে কোনো কারণ-ই ছিল না। সে আমাকে দিয়ে প্রেমের নেশা শিখেছে আর অন্য একজনকে দিয়ে সে নেশায় মত্ত হয়েছে। সুস্মিতা আমাকে ছেড়ে যাওয়ার আগে পরিবারে অনেক অঘটন ঘটিয়েছে তাতেও তার প্রতি আমার বিন্দু পরিমান ভালোবাসা হ্রাস পায়নি, আমি তাকে এখনো অসম্ভব রকমে ভালোবাসি। এক যুগ পেরিয়ে গেছে ; এ এক যুগ পরেও যদি সে ফিরে আসতে চায় আমি নির্দ্বিধায় তাকে মেনে নেবো। আপন করে নেবো ক্লাস টেনে পড়ুয়া কিশোরী সুস্মিতার মতো করে।
সুস্মিতা আমি তোমার মাংস বিলাসী প্রেমে মত্ত হইনি,
আমি মত্ত হয়েছি তোমার মায়ায়।

রশিদ কল দিয়েছিল ধরতে পারিনি। হয়তো ভেবেছে রাগ করেছি। আমি কল ব্যাক করবো ভেবেও আবার কি ভেবে পত্রিকা নিয়ে বসে গেলাম। বুয়া এসে চা দিয়ে গেলো। চা-এ চুমুক দিতে দিতে পত্রিকার বড়ো ছবিটার ওপর নজর দিলাম। সেখানে আলবার্ট আইনস্টাইন তার জিভ বের করে রেখেছে।

বনকপোত
রাফিউজ্জামানের বাসায় আজ সকালে তার বন্ধু রশিদ এসেছে। রশিদের সাথে তার বহুদিন পর দেখা। অনার্সের শেষের দিকে যেয়ে যে রশিদের কেবল অল্প ক’টা গোঁফ গজিয়েছিলো এখন সে রশিদের নাকের নিচেই কাচা-পাকা লম্বা গোঁফ। বয়সটা কোন দিয়ে পেরিয়ে গেলো টেরও পাওয়া যায়নি। বহুদিন পর রশিদের দেখা পেয়ে রাফিউজ্জামানের খুব উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। কথার ফাঁকে ফাঁকে একটার পর একটা সিগারেট জ্বালিয়ে যাচ্ছে।
রাফিউজ্জামান তার বন্ধু রশিদকে বলার জন্য অনেক কথা জমা করে রেখেছিলেন ; যে কথা গুলো এতোদিন কাউকে বলা যাচ্ছিল না, তিনি আজ সে সব কথা রশিদের কাছে বলতে পেরে নিজেকে একটু হালকা অনুভব করছেন। নিজের কর্মজীবন, সংসার, সাহিত্য সব মিলিয়ে তিনি রশিদকে জীবনের একটা লম্বা ঘটনার জানান দেন। রশিদের আজ বাড়ি ফিরা হবে না , ফিরতে চাইলেও রাফিউজ্জামান আজ তাকে যেতে দেবেন না। রশিদ রাফিউজ্জামানকে বনকপোতের গল্প শুনান।

একটা মেয়ে লিফটে করে ওপরে ওঠছে। তার পাশেই মিনার দাঁড়িয়ে আছে। মিনার’রা থাকে সেভেন’থ ফ্লোরে। মেয়েটাকে সে প্রায় দূর থেকে দেখে, মাঝে মাঝে তাদের লিফটে দেখা হয়। আজও দেখা হয়েছে। মিনার মেয়েটার দিকে তাকিয়ে আছে, তার তাকানোতে চোখের গভীরতা থেকে আবেগের গভীরতা প্রবল। মিনার বলল-
‘ কি নাম তোমার?’
‘ কেন? ‘
‘ দেয়ালে লিখব তাই।’

রাফিউজ্জামান রশিদকে থামিয়ে দিয়ে বিরক্ত হয়ে বলল,’ প্রেমের গল্প বলবি না। কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রেমের অনেক রূপ দেখেছি, বন্ধু বান্ধবদের প্রেমের গল্প শুনতে শুনতে এখন প্রেমের গল্পে খুব বিরক্ত হই৷’
‘ মানুষ তার যৌবনে প্রেমের গল্পে পায় বৃষ্টি, যৌবনের শেষের দিকে সে গল্পেই পায় ঝড়াঘাত,আর যৌবন ফুরালে প্রেমের গল্পে শুধু পরে রয় গ্লানি। সে গ্লানি কাঁধে নিয়েই মানুষ বাকি জীবন পারি দেয়।’
এ বলতে বলতে রশিদ সোফা থেকে ওঠে দাঁড়ালো। রাফিউজ্জামান কোনো কথা বললেন না। রাফিউজ্জামান ভেবেছিলেন সে ওয়াশরুমে যাবে কিংবা ওপরের ঘরে যাবে কিন্তু হারামজাদা যে এই ভাবে না কয়ে চলে যাবে তা তিনি ভাবেননি।
ঘন্টাখানিক হয়ে গেলো রশিদের দেখা না পেয়ে রাফিউজ্জামান কি-বোর্ডের বাটন টিপে গটগট করে তার জীবনের বনকপোতের গল্প লিখতে আরম্ভ করেন :
কারও জীবনের বনকপোতের গল্প তিন-তিনশ কিংবা তিন হাজার পেজ লিখেও এর সম্পূর্ণ বহিঃপ্রকাশ করা সম্ভব হবে না। এটা শুধু আমি কেনো! সাহিত্যে নোবেল পাওয়া বিশ্ব কবি রবি ঠাকুর ও পারবে না। তবু পাঠক কে সামান্য কিছু গল্পের জানান দেওয়ার জন্য আমার এই লিখতে বসা ; সামান্য চেষ্টা।

রাফিউজ্জামান তার জানালা দিয়ে বাহিরে তাকালেন। দেখেন পুরো আকাশ থেকে মেঘেদের লোপাপত্তি হচ্ছে। দূর থেকে দেখা যায় বনকপোত তাদের বাড়ির দিকে এগিয়ে আসছে। রাফিউজ্জামান দৌড়ে ছাদে গেলেন। যেয়ে দেখলেন স্মৃতি সেখানে প্যারাপেটের ওপর হাত রেখে দাঁড়িয়ে আছে। তখন বনকপোত এসে তাদের দু’জনের কাধে চেপে বসলেন। অতীতের অভিমান, দূঃখের পাহাড়, সমুদ্রের মতো ভুলভ্রান্তি গুলোকে বনকপোত এসে তাদের সাথে নিয়ে যায়। রাফিউজ্জামান চোখ বন্ধ করলেন । স্মৃতি বাবা বলে ডাকছেন রাফিউজ্জামান সারা দিচ্ছেন না। স্মৃতি তাকে সাপটে ধরলে রাফিউজ্জামান অভিমান করে মুক্তি চাইলেন না ; কেবল বাতাসের সাথে মিশে পকেট থেকে সবুজ কালির একটা কলম বের করে ছোট্ট কাগজের টুকরোতে লিখলেন :
জগতে বুঝনি মোরে
এখন খুঁজও কোন তাড়নায়
আমি তো ছিলাম ব্যর্থ পিতা
তবে কাঁদো কোন বেদনায়!
এখন আর কেঁদোনা স্মৃতি
আমার স্মৃতি যাও…

add 1


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

অন্যান্য লেখা সমূহ

আজকের দিন-তারিখ

  • সোমবার (সন্ধ্যা ৭:২২)
  • ২০ মে, ২০২৪
  • ১১ জিলকদ, ১৪৪৫
  • ৬ জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩১ (গ্রীষ্মকাল)
Raytahost Facebook Sharing Powered By : Sundarban IT