• আজ- মঙ্গলবার, ১৬ এপ্রিল ২০২৪, ১২:৩২ পূর্বাহ্ন
Logo

অদৃশ্য বন্ধন

রঞ্জিত দে / ১১৭ বার দেখা হয়েছে
আপডেট : বুধবার, ১২ এপ্রিল, ২০২৩

add 1
কিরে বাবু আসবি নাকি একবার? আয় তোর মন ভরিয়ে দেবো, আয় না বাবু, আয় না রে,,
সুজন রাস্তার ফুটপাত ধরে হেঁটে যাচ্ছিল, সন্ধ্যা নেমেছে রাতের কলকাতায়, ঝলমল করছে শহরের চারদিক। দুদিকের রাস্তা দিয়ে গাড়ি অনবরত ছুটে চলেছে, সুজন একজন বেকার যুবক, ওর চাকরির জন্যে এক ভদ্রলোক ওকে ডেকেছিলেন তার কাছেই ও যাচ্ছে, উনি সন্ধ্যার দিকে যেতে বলেছিলেন তাই সময় নিয়েই সুজন ওনার কাছে যাচ্ছে।
ছোটোবেলায় বাবা মারা গেছে সুজনের, মা গৃহবধু, একটা বোন আছে ওর, সে বর্তমানে পড়াশোনা করছে। সুজন শিক্ষিত ছেলে, গ্ৰাজুয়েশন করে বর্তমানে টিউশন করে সংসার চালানোর সাথে সাথে বোনের পড়াশোনাও চালিয়ে যাচ্ছে। পরিবারের একমাত্র রোজগেরে সুজনের পক্ষে কয়েকটা টিউশনির উপর দাঁড়িয়ে সংসার চালানো খুব দুরুহ হয়ে উঠেছে, তাই চাকরির খোঁজ। এক সহৃদয় ভদ্রলোকের কথামতো তার সঙ্গে দেখা করতে বেরিয়েছে ও। একটা টিউশন বাড়িতে পড়াতে গিয়ে সেই বাড়ির আত্মীয় এক ভদ্রলোকের সাথে সুজনের দেখা হয়ে যায়, ওনার নাম রতন সেন উনি একজন বড় ব্যবসায়ী। বাগবাজারে ওনার বড় একটা হার্ডওয়্যারের দোকান আছে। সুজনের ছাত্রী ক্লাস নাইনের টিনার কাছ থেকে ভদ্রলোক শুনেছিলেন সুজন খুব মনোযোগ দিয়ে পড়ায় তাই টিনা পরীক্ষায় ভালো নম্বর পেয়ে ক্লাস নাইনে উঠেছে।ভদ্রলোকের দোকানের জন্য একজন ভালো সৎ শিক্ষিত কর্মীর প্রয়োজন, টিনার কাছে সব শুনে, উনি নিজেই সুজনের সাথে দেখা করার আগ্ৰহ প্রকাশ করেন এবং সুজন যখন পড়াতে আসে তখনই সুজনের সাথে দেখা করে তার শ্যামবাজারের বাড়িতে দেখা করতে বলেন, সেই মতো সুজনের ওনার সাথে দেখা করতে যাওয়া। মেয়েটির ডাকে দাঁড়িয়ে যায় সুজন।খেয়াল করে ও যেই জায়গা দিয়ে হাঁটছে সেই জায়গাটা কলকাতার সব থেকে বড় নিষিদ্ধপল্লী।মেয়েটিকে দেখে মেয়েটির মুখের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করে সুজন,
-কিছু বললেন?
– বাবু আজ সারাদিন একজনও কাষ্টমার পাইনি, লকডাউনের পর থেকে এমনি আমাদের আয়পত্তর কমে গেছে,,, দুপুরে খাওয়াও জোটেনি রাতেও জুটবে কিনা জানিনা,,, আয় না বাবু তোর খুব ভালো লাগবে তোকে খুব যত্ন করে সেবা করব,,,
মেয়েটি অভুক্ত শুনে খুব খারাপ লাগে সুজনের, মেয়েটাকে দেখতে শুনতে তো বেশ ভালোই, তবে কেনো এই লাইনে,,এদিকে পকেটের অবস্থাও তো ভালো না, টিউশন বাড়িতে মাইনেও সময়মতো কেউ দেয় না, যদি মেয়েটাকে একটু সাহায্য করা যেত,,, ভাবে সুজন।
পকেটে হাত দিয়ে দেখে সত্তরটা টাকা মাত্র পড়ে আছে , সেখান থেকে,,,,,
– দেখুন আমি কোথাও যাবো না আমি খুব ব্যস্ততার মধ্যে আছি তবে আমার কাছে পঞ্চাশটা টাকা আছে এটা নিয়ে খেয়ে নিতে পারেন, সুজন বলে,
– সেকি বাবু তুই কিছু করবি না এমনি এমনি পয়সা দিবি কেনো?
– ধরুন টাকাটা, আমি চললাম ভালো থাকবেন,
মেয়েটি সুজনের দিকে হা করে তাকিয়ে থাকে, ভাবে কিছু না করে এমনি এমনি টাকা দিয়ে গেলো লোকটা? এরকম লোক আছে নাকি যে মেয়েমানুষের শরীর ভোগ করার কথা চিন্তা না করে শুধু শুধু পয়সা দেয়?
টাকাটা নিয়ে মেয়েটি এগোয় খাবারের দোকানের দিকে, কিছু খেতে হবে সকাল থেকে কিছু পেটে পড়েনি, লোকটা মনে হয় খুব ভালো,,, ভাবে মেয়েটি, সুজন হাটতে হাটতে শ্যামবাজারে পৌঁছে যায়। ভদ্রলোকের বাড়ি খুঁজে বার করতে হবে। যেতে যেতে সুজন ভাবছিলো মেয়েটা এত সুন্দর দেখতে কিন্তু এই লাইনে এলো কি করে,,,, সেই সময়ের ছবিটা ওর চোখে ভেসে উঠলে কৌতুহল বাড়ে সুজনের, যদি আরো দুটো কথা বলতে পারতো তাহলে হয়তো জানা যেতো কি করে এলো এই বাজে লাইনে।আর একবার যদি দেখা হতো,,,,,এইসব নানা কথা ভাবতে ভাবতে শ্যামবাজারে পৌঁছে ঠিকানাটাও পেয়ে যায় এবং রতন সেনের সঙ্গে দেখা হয়ে যায়। সুজনের সঙ্গে কথা বলে রতন সেনের এমনি পছন্দ ছিল ওকে, এবারে পাকা কথা বলে নিয়ে বাগবাজারের নতুন হার্ডওয়ারের দোকানে হিসাবপত্র দেখাশোনার কাজটা দিয়ে দেন সুজনকে।মাইনেপত্তর আপাতত সামান্য, মাত্র পাঁচ হাজার টাকা তবে দোকানের ব্যবসা একটু বাড়লে তখন আবার বাড়ানো যাবে, জানিয়ে দেন রতন সেন।
আপাতত খুব খুশি সুজন, পাঁচহাজার টাকা অনেক টাকা সুজনের কাছে, টিউশনিতে সর্বসাকুল্যে আড়াই হাজার টাকার মতো পেতো, এবার টিউশনের সাথে আর কাজটা করলে মোটামুটি চলে যাবে সংসারটা আর সেই সঙ্গে সঙ্গে বোনের পড়াশোনাও হবে।রতন সেনের বাড়ি থেকে বেরিয়ে সুজন ভাবতে থাকে ‘এতোদিন কতো জায়গায় ঘুরেছে কোথাও কিছু পায়নি, কিন্তু আজকেই কাজটা পেয়ে গেলো, মেয়েটার সাথে দেখা হওয়াতেই কি কাজটা হলো নাকি সবটা কাকতালীয় ? একটু সময়ের জন্যে মেয়েটিকে দেখলেও ওর ছবিটা বুকে আঁকা হয়ে গেছে সুজনের, কেনো এরকম হলো বুঝতে পারেনা সুজন, একটা দেহোপজীবিনী মেয়ে তার প্রতি এতো,,,
বিডন স্ট্রীটের বাড়ি থেকে বাগবাজারের দোকানে রোজ হেটে যাতায়াত করে সুজন, মনের মধ্যে একটা ক্ষীন আশা যদি একবার দেখা হয়ে যায় মেয়েটির সাথে,,,
           প্রথম মাসের বেতন পেয়ে দোকান থেকে বেরিয়ে একটু দুরে একটা চায়ের দোকানে বসে সুজন। চা নিয়ে ভাঁড়ে চুমুক দিতে দিতে সুজন ভাবে মায়ের জন্য একটা শাড়ি কিনতে হবে আগে আর বোনকে হাতে টাকা ধরিয়ে দেবে ওর জামাকাপড় কেনার জন্যে, ও ওর পছন্দ মতো কিনে নেবে তারপর ওর নিজের জন্য সামান্য কিছু রেখে বাকি টাকাটা মায়ের হাতে তুলে দেবে।
সুজন দিনরাত পরিশ্রম করছে এখন। সেই সকাল সাতটা থেকে দুটো টিউশন করে তারপর বাড়ি ফিরে চান খাওয়াদাওয়া করে সাড়ে দশটার মধ্যে দোকান, আবার সন্ধ্যা সাতটায় ছুটির পরে দোকান থেকে বেরিয়ে সোজা টিউশন বাড়ি সেখানে রাত দশটা অবধি পড়িয়ে তারপর বেরোনো। আগে বোনের পড়াশোনা যাতে ভালোভাবে হয় সেটা দেখতে হবে ওকে তারপর সব। চায়ের দোকানে পয়সা মিটিয়ে বেরিয়ে পড়ে সুজন, হাটতে হাটতে এসব কথাই ওর মাথায় ঘোরাঘুরি করে।
– বাবু আসবি নাকি,আয় তোর মন ভরিয়ে দেবো,
 সেই গলা না ঝটকা খেয়ে সুজন ঘুরে দেখে সেই মেয়েটা,
– তুমি, কেমন আছো?
– আরে বাবু তুই? সেইদিন তুই এসেছিলি না পঞ্চাশ টাকা দিলি খাবার জন্য কিছু না করেই চলে গেলি, তুই খুব ভালো বাবু, চল তোকে একটু চা খাওয়াই, চল আমার ঘরে, না না তোকে আজ কিছু দিতে হবে না, চল বাবু, আয় আমার সাথে, মেয়েটি এগিয়ে যায় সুজন মেয়েটির পিছনে মোহবিষ্টের মতো হাটতে থাকে, কেনো যে যাচ্ছে সেটা ও জানে না।
ঘরের মধ্যে দারিদ্রতার ছাপ স্পষ্ট। মেয়েটি সুজনকে খাটের ওপর বসায়, বলে ‘বাবু সেদিন খুব উপকার করেছিলি নাহলে সেদিন খাওয়া হতো না রে, এখানে কেউ কারো না,
সুজন সেদিনের চাকরি পাবার ঘটনাটা মেয়েটিকে বলে তারপর পকেট থেকে দুশো টাকা বের করে মেয়েটির হাতে দিয়ে বলে আজ প্রথম মাইনে পেয়েছি এটা রাখো।
– কেনো বাবু, এখন অসুবিধা নেই রে আমার, এখন লাগবে নারে তুই খুব ভালো মানুষ তোর কাছে পয়সা নেবো না,
– তবু তুমি রাখো আবার তোমার সাথে দেখা হবে অনেক কথা বলার আছে, হঠাৎ বলে ফেলে সুজন,
– তুই আবার আসবি বাবু? আচ্ছা আসিস, কিন্তু এই জায়গা বড় খারাপ রে, ভদ্রলোকের ছেলে তুই,
– ঠিক আছে আজ আসি, পরে আবার দেখা হবে কোনো একদিন বলে টাকাটা জোর করে হাতে গুজে দিয়ে আস্তে আস্তে ঘর থেকে বেরিয়ে পড়ে সুজন।
রাস্তায় বেরিয়ে ভাবে মেয়েটির নামটা তো জানা হলো না, আবার খুব শিগগিরই দেখা করবে মেয়েটির সাথে। মেয়েটির প্রতি একটা অদ্ভুত টান অনুভব করে সুজন, মেয়েটিকে দেখে বাঙালি মনে হয় না, কথার মধ্যে কেমন যেনো অবাঙালি টান আছে একটা।
বাড়ি যাবার পথে একটা দোকান থেকে মায়ের জন্য শাড়ি কেনে, তারপর ছাতুবাবুর বাজার থেকে কিছু বাজার করে নেয় সুজন, একটু মুরগির মাংস কয়েকটা ডিম সবজি কিনে তারপর মিষ্টির দোকান থেকে মিষ্টি কিনে বাড়ির দিকে হাটা দেয়।
বাড়ি ফিরে বোনকে কিছু টাকা দিয়ে নিজের জন্যে কিছুটা রেখে বাকিটা মায়ের হাতে তুলে দিয়ে একটা প্রণাম করে। মায়ের হাসিমুখ দেখে মনটা খুব ভালো হয়ে যায় সুজনের, মেয়েটার মুখটাও হঠাৎ করে ভেসে ওঠে ওর মনে,
এভাবে বেশ কিছুদিন কেটে যায়, যাতায়াতের পথে আর মেয়েটার সঙ্গে আর দেখা হয়নি সেদিনের পর থেকে সুজনের,প্রথম দিকে ওই রাস্তা দিয়ে যাবার সময় এদিক ওদিক তাকিয়ে মেয়েটিকে খুঁজতো সুজন কিন্তু আর দেখা যায়নি ওকে , আস্তে আস্তে কাজের চাপে মেয়েটির কথা মন থেকে মুছেও যায়। এদিকে বোনটা খুব ভালো নম্বর পেয়ে উচ্চ মাধ্যমিক পাশ করে ফেলে, সুজনের কাজ দেখে বেশ খানিকটা মাইনেও বাড়িয়ে দেন রতন সেন, সেই সঙ্গে বলেন, ‘সুজন তুমি এবার সরকারি চাকরির পরীক্ষা দাও, আমার ধারণা তুমি পেয়ে যাবে তোমার যা পড়াশোনা তাতে তুমি পাশ করে চাকরি পেয়ে যাবে আমি নিশ্চিত’,
– স্যার আমি তো কিছুই জানিনা কিভাবে কি করতে হয়,
– আমি তোমাকে ফর্ম এনে ফিলআপ করিয়ে দেবো চিন্তা কোরো না সামনে রেলের একটা পরীক্ষা আছে তুমি সেই পরীক্ষাটা দেবে তোমার যা কোয়ালিফিকেশন তাতে তুমি পরীক্ষা দিতে পারবে আমি তোমাকে সাজেশন বই আনিয়ে দেবো তুমি সেটা রাতের দিকে ভালো করে পড়বে দেখবে তুমি ঠিক পাশ করে যাবে,
নির্দিষ্ট দিনে বাড়ি থেকে মাকে প্রণাম করে্ রেলে চাকরির পরীক্ষা দিতে যায় সুজন, পরীক্ষার হলে বসে হঠাৎ করে মেয়েটির কথা মনে পড়ে যায় ওর,ভাবে কতদিন যে দেখা হয়নি,
পরীক্ষার সিট পড়েছিল শ্যামবাজারের মনীন্দ্র কলেজে, পরীক্ষা দিয়ে খুব নিশ্চিন্ত লাগে সুজনের, পরীক্ষাটা খুব ভালো হয়েছে ওর।যা যা পড়েছে তার মধ্যে থেকেই সব প্রশ্ন এসেছে আর সবটার উত্তর ও ভালোভাবেই দিয়েছে। পরীক্ষার হল থেকে বেরিয়ে একটা চায়ের দোকানে গিয়ে চা খেয়ে হাঁটা দেয় ও, বেশ কিছুটা হেটে ফুটপাত পরিবর্তন করে যেখানে মেয়েটির সঙ্গে দেখা হয়েছিল সেদিক দিয়ে হাটতে থাকে,হঠাৎ ওর চোখে পড়ে ‘আরে ঐ তো মেয়েটা বসে আছে’ তবে মুখটা শুকনো লাগছে ভীষণ,আগে দুবার দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেছিলো সুজন আর এখন একটা জলচৌকিতে ফুটপাতের কোন ঘেষে বসে আছে মেয়েটা।তাড়াতাড়ি সুজন পৌঁছে যায় মেয়েটির কাছে,
– কেমন আছো তুমি, আমাকে চিনতে পারছো?
– কিরে বাবু তুই, তোকে চিনতে পারবো না,তুই তো আমাকে ভুলেই গেছিস, একদিকে ভালো হয়েছে এই জায়গা তোদের জন্য নয়রে বাবু, আমার শরীর ভালো ছিল নারে, খুব কষ্ট পেয়েছি কয়েকটা দিন, ডাক্তার ওষুধ দিয়েছে, থাক এসব, যাবি নাকি বাবু আমার ঘরে, কিন্তু তুই তো কিছু করবিনা তাই তুই পয়সা দিতে পারবিনা, চল তোকে চা খাওয়াই,
– চলো, আজ আমার মনটা খুব ভালো আজ কিছুক্ষণ বসবো তোমার ঘরে আর তোমার হাতের চা খাবো শুধু, আচ্ছা কি হয়েছিলো তোমার?
– ওই বাবু বুকে একটা দোষ ধরা পড়েছিল বলে এখানকার ডাক্তার  হাসপাতালে ভর্তি হতে বলেছিল কিন্তু আমি হইনি, ওসব বুকের অসুখ ওষুধ খেলেই সেরে যায়, আর এখন তো হাতে পয়সা নেই বাবু, কয়দিন কাজও নিতে পারিনি বিছানায় পড়েছিলাম, আমার তো কেউ নেইরে, ওই পাশের ঘর থেকে মালতী খেতে দিয়েছিল ওই খেয়ে কোনোরকমে কাটিয়ে দিয়েছি, এতদিন ঘরেই ছিলাম আজ একটু বাইরে বেরিয়ে বসেছি আর আজকেই তোর সঙ্গে দেখা হয়ে গেলো,ছাড় ওসব বাবু আগে ঘরে চল ঘরে বসেই কথা বলবো,
– ঠিক আছে চলো তোমার ঘরে।
ঘরে ঢুকে খাটের ওপর বসে সুজন, মেয়েটি বলে বাবু তুই আরাম করে বস তোর জন্য আগে চা বানাই
– ঠিক আছে বানাও
এর মধ্যে ঘরে উঁকি মেরে ঘরের দরজাটা খটখট করে একটা মেয়ে,
– আরে মালতী,আয় ঘরে আয়
– না থাক খদ্দের আছে
– আরে নারে সেই বাবুটা তোকে বলেছিলাম না যে টাকা দিয়েছিল কিছু করেনি,,,
– ও সেই বাবু
এবার মালতী ঘরে এসে সুজনের দিকে তাকিয়ে দেখে ভালো করে তারপর বলে
– আরে বাবু আপনার কথা কতো বলে রজনী, কতদিন আপনার সাথে দেখা হয়নি ওর নাকি, ও বলছিলো বাবু জানলে ঠিক ভালো একটা ডাক্তার দেখিয়ে দিতো,ওতো এখন আগের মতো কাজ পায়না,
– কি হয়েছে ওর
– ওই বুকের দোষ,
রজনী চা নিয়ে এসে বলে
– বাবু ছাড়তো ওসব তুই আগে চা খা,
মালতী বলে যাই রে পরে আসবো,
সুজন চায়ে চুমুক দিতে দিতে বলে,,
– আজ আমি একটা চাকরির পরীক্ষা দিতে গিয়েছিলাম, পরীক্ষার হলে তোমার কথা মনে পড়ে গেলো, তারপর রাস্তায় তোমার সাথে দেখাও হয়ে গেলো,
– কিসের পরীক্ষা বাবু
– ওই রেলে চাকরির পরীক্ষা,
– তাই নাকিরে বাবু, ও তুই ঠিক চাকরি পেয়ে যাবি দেখিস তুই খুব ভালো মানুষ,
– কি করে বুঝলে তুমি?
– ও আমার মন বলে দেয় বাবু দেখিস তুই, যখন পাবি তখন আমার কথা তোর ঠিক মনে পড়বে, মিলিয়ে দেখিস তুই
– আচ্ছা তোমাকে একটা কথা বলবো রজনী?
– কি কথা বাবু?
– তুমি এখানে এলে কি করে
রজনী সুজনের মুখের দিকে করুণ ভাবে তাকিয়ে থাকে, তারপর বলে,
– কি হবে এসব শুনে বাবু যা হবার হয়ে গেছে, তুই এখন কেমন আছিস বল?
– আমি ভালো আছি, আমাকে একটু বলো না খুব জানার ইচ্ছে, তোমার মতো ভালো মেয়ে এখানে এলো কি করে?
– ভালো মেয়ে? নারে বাবু ভালো নয় আমি,না হলে কেউ এখানে আসে? তা শুনতে চাইছিস যখন শোন,
আমার বাড়ি বিহারের দ্বারভাঙায়,আমি ইস্কুলে আট ক্লাস অবধি পড়েছি বাবু,তারপর বাবা বিয়ে দিয়ে দেয় পাশের গ্ৰামের জগনের সাথে, আমার বাবা খুব গরীব ছিল, তাই খরচ করতে পারেনি, তাই বিনাখরচেই আমাকে বিয়ে করে জগন, তখন বুঝতে পারিনি, ভেবেছিলাম জগন খুব ভালো মানুষ,বিয়ের পর কয়েকদিন বেশ ভালোই কেটেছিল, তারপর একদিন,,,
কিছুক্ষণ থেমে আবার শুরু করে রজনী,,
-জগন বললো চলো কলকাতা ঘুরে আসি, আমি তো খুব খুশি, শুনেছি কলকাতা অনেক বড় শহর, বড় বড় গাড়ি চলে আকাশ দিয়ে পেলেন চলে, খুব আনন্দ তখন আমার মনে,,,,, তারপর একদিন এখানে নিয়ে এলো, সেদিন খুব ক্লান্ত ছিলাম বলে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম, সকালে উঠে দেখি জগন নেই, ভাবলাম হয়তো বাইরে গেছে, কিন্তু জগন আর কোনোদিন ফিরে আসেনি তারপর অনেক কেঁদেছি কিন্তু কিছু হয়নি, পরে মাসির কাছে শুনেছিলাম ও আমাকে বিক্রি করে দিয়েছে অনেক টাকায়,মাসি বলেছিল এখানে যে একবার আসে সে আর ফেরে না, আমিও আর বাড়ি ফিরতে পারিনি বাবু, আর ফিরলেও তো ঘরে তুলতো না কেউ বাবু, আমি যে নষ্ট হয়ে গেছি,বল এরকম নষ্ট মেয়েকে ঘরে কেউ রাখে? তাদের মান আছে না?এই পাড়ায় এরকম একজন আছে সে এখান থেকে পালিয়ে বাড়ি চলে গিয়েছিল, কিন্তু কেউ ওকে ঘরে তোলেনি ওকে, আবার ও ফিরে এসেছে এই এখানেই,
সুজন সব শোনে চুপ করে, ওর মন উথাল পাথাল হয়ে যায়,ভাবে একটা সরলমতি গ্ৰামের মেয়ের জীবন এইভাবে একজন বিয়ের নামে নষ্ট করে দিলো? কিছুক্ষণ চুপ করে থাকে সুজন, রজনী গালে হাত দিয়ে ঘরের সিলিংয়ের দিকে তাকিয়ে থাকে, চোখ দিয়ে ফোঁটা ফোঁটা জল বেরিয়ে আসে ওর,
চুপ করে সুজন রজনীর সব কথা শুনে তারপর পকেটে হাত দিয়ে পাঁচ হাজার টাকা বার করে, এই টাকা ও একটু একটু করে জমিয়ে রেখেছিল, উঠে দাঁড়িয়ে রজনীকে বলে,
– শুনলাম তোমার জীবনের সব কথা, এভাবে একটা মানুষের স্বপ্নকে ভেঙে দিয়ে জীবন যারা নষ্ট করে দেয় তারা কোনোদিন কোথাও সুখ পাবে না। শোনো রজনী এই কটা টাকা তুমি রাখো তোমার ওষুধপত্রে খরচ কোরো, আমি ছোট একটা চাকরি করি তাই বেশি দিতে পারলাম না, ভালো চাকরি পেলে আমি,,,
– না বাবু, এটা তোর খাটনির টাকা,এ আমি নিতে পারবো না, শরীরের কারবার করতে পারি বাবু কিন্তু আমি খারাপ নয়রে,, বলতে বলতে আবার কেঁদে ফেলে রজনী,,
– এটা তোমাকে রাখতে হবে কারন তুমি এখন বসে আছো, তোমার শরীর খারাপ, রোজ সবাই খেতে দেবে কি করে,,,শোনো এই টাকাটা আমি বিছানাতে রাখলাম তুমি তুলে নিও,,,,,পরে আবার আসবো কোনোদিন, শরীরের যত্ন নিও, বলে
বেড়িয়ে আসে সুজন, ওর মনটা খুব খারাপ হয়ে গেছে রজনীর কথা শুনে,,,একটা ফুটফুটে মেয়ে নিজের জীবনের সবকিছু হারিয়ে বাড়ি থেকে অনেক দুরে এই শহরের বদ্ধ নোংরা গলিতে এসে নিজেকে বাঁচিয়ে রাখতে শরীর বিক্রি করে চলেছে দিনের পর দিন, শরীর খারাপ হলে কেউ পাশে থাকে না। অসহায় একটা জীবন,,,,আর ভাবতে পারেনা সুজন।
আবার নিত্যকার দিনে ফিরে গেছে সুজন, সেই টিউশন আর রতন পালের দোকানে চাকরি, মন চাইলেও রজনীর ওখানে যেতে পারেনা, এমনকি ওই দিকের ফুটপাত দিয়েও যায় না, কেউ যদি দেখে তো ওকে খারাপ ভাবতে পারে,
একদিন দোকানে বসে খাতা লিখছে সুজন, রতন পাল দোকানে ঢুকে চেয়ারে বসে বলে ‘হ্যাঁরে সুজন কি রেজাল্ট হলো তোর,পাশ করেছিস’?
আকাশ থেকে পড়ে সুজন,বলে ‘কিসের পাশ স্যার আমি তো কিছু বুঝতে পারছি না,
— সে কিরে, তুই তিনমাস আগে রেলের পরীক্ষা দিয়েছিলি না?
— হ্যাঁ দিয়েছিলাম তো,
— আরে আজকে রেজাল্ট বেরিয়েছে নেটে,তুই জানিস না?
— না তো স্যার আমাকে তো কেউ কিছু বলেনি?
— দুর বোকা কে বলবে, তোকে নিজেকেই খবর রাখতে হবে সব,,,,তুই রোল নাম্বারটা দে আমি মোবাইলে দেখে নিচ্ছি,
সুজন মানিব্যাগ থেকে একটা কাগজে লেখা রোল নাম্বারটা বার করে রতন পালের হাতে দেয়, উনি মোবাইলে নেট অন করে খুঁজতে থাকেন রোল নম্বর,
কিছুক্ষণ পর উনি হঠাৎ দাঁড়িয়ে পড়েন ‘এই আমার চশমাটা দে তো সুজন?
সুজন চশমাটা নিয়ে ওনার হাতে দেয়, চশমাটা পড়ে আবার মোবাইলে চোখ রাখেন উনি,, কিছুক্ষণ পর চেঁচিয়ে বলেন “সুজন এইতো তোর রোল নম্বর,, তুই তো পাশ করেছিস রে,আরে কে কোথায় আছিস একটু মিষ্টি নিয়ে আয়, আমাদের সুজন রেলে চাকরি পেয়েছেরে’ বলেই হা হা হা হা করে হাসতে থাকে রতন পাল,,
সুজন চমকে ওঠে,,,ও পাশ করেছে চাকরির পরীক্ষায়,,, ভাবতে পারেনা সুজন,,
রতন পাল বলেন ‘এবারে তোর নতুন জীবন শুরু হবেরে সুজন, বাড়িতে চাকরির নিয়োগপত্র এলে সেখানে তারিখ দেওয়া থাকবে, সেদিন তুই অফিসে চলে যাবি আর চাকরিতে জয়েন করে নিবি,যা সুজন আজকে তোকে ছুটি দিয়ে দিলাম, বাড়িতে গিয়ে সুখবর দে মাকে, খুব খুশি হবে রে তোর মা, আর যতদিন না জয়েন করছিস ততদিন এখানেই কাজ করিস নাকি?
সুজন উঠে রতন পালকে একটা প্রণাম করে কেঁদে ফেলে,,স্যার আপনি না থাকলে আমি কিছু করতে পারতাম না,আপনি স্যার আমাকে উৎসাহ দিয়ে খোঁজখবর নিয়ে পরীক্ষা দেবার ব্যবস্থা করে দিয়েছেন,তাই আজ চাকরি হবে আমার, আপনার ঋণ কোনোদিন শোধ করতে পারবো না স্যার’
রতন পাল সুজনকে বুকে জড়িয়ে ধরে বলেন ‘তুই খুব ভালো ছেলে সৎ ছেলে তোর অনেক উন্নতি কামনা করি আমি,তুই আগে বাড়ি যা পরে কথা হবে,  সুজন দোকান থেকে বেড়িয়ে হাঁটতে থাকে, হঠাৎ মনে পড়ে রজনীর কথা ‘আরে ওই তো প্রথম বলেছিল আমি চাকরি পাবো, বলেছিল চাকরি পেলে ওর কথা মনে পড়বে,তাইতো মনে তো পড়লো, সঙ্গে সঙ্গে মিষ্টির দোকান থেকে মিষ্টি কিনে নিয়ে উল্টোদিকের ফুটপাত ধরে হাঁটতে থাকে সুজন,,, রজনীর সাথে দেখা করতেই হবে ওকে, দুবার বাড়ি গিয়েছে রজনীর তাই রাস্তা চিনতে অসুবিধা হয়নি, গলির মধ্যে ঢুকে ওর ঘরের দরজায় এসে দাঁড়ায়, কড়া নাড়তে গিয়ে দেখে তালা ঝুলছে, কি হলো কোথায় গেলো, পাশের ঘর থেকে সুজনকে দেখে মালতী বেড়িয়ে আসে,
– কি ব্যপার বাবু আপনি?
– রজনীর কাছে এসেছিলাম ও কোথায়?
– সেই এলেন বাবু আর কিছুদিন আগে আসতে পারলেন না?
– কেনো ওকি বাড়ি চলে গেছে?অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করে সুজন,
কিছুক্ষণ থেমে মালতী বলে ‘হ্যাঁ বাবু তবে বাড়ি নয় ও চিরকালের জন্য আমাদের সবাইকে ছেড়ে চলে গেছে’
চমকে গিয়ে সুজন জিজ্ঞেস করে ‘মানে’?
– আপনি চলে যাবার পর কিছুদিন বাদে ওর বুকে আবার ব্যথা ওঠে,আমরা সবাই ওকে তাড়াতাড়ি করে হাসপাতালে নিয়ে গিয়ে ভর্তি করি, আপনার কথা বলছিল খুব বাবু যে ‘বাবুকে তোরা পারলে একবার খবর দিস বাবু এই রাস্তা দিয়েই যায়, খুব ইচ্ছা করছে বাবুকে দেখার জন্য, ও বলেছিল আপনি খবর পেলেই চলে আসবেন ওকে দেখতে, ও আপনাকে খুব নিজের মনে করতো বাবু’, কিন্তু আপনার ঠিকানা তো জানিনা আর রাস্তার দিকে অনেকবার দেখেছি কিন্তু আপনার দেখা পাইনি, তারপর হঠাৎ হাসপাতাল থেকে খবর আসে একদিন যে রজনী হার্টফেল করে মারা গেছে ভোরবেলায়,,,সেও একমাস হতে চলল’ বলেই কেঁদে ফেলে মালতী।
সুজনের হাত থেকে মিষ্টির প্যাকেটটা পড়ে যায়, একি বুকে এতো কষ্ট হচ্ছে কেনো? চোখ দিয়ে অঝোরে জল ঝরে দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে যাচ্ছে সুজনের…
add 1


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

অন্যান্য লেখা সমূহ

আজকের দিন-তারিখ

  • মঙ্গলবার (রাত ১২:৩২)
  • ১৬ এপ্রিল, ২০২৪
  • ৬ শাওয়াল, ১৪৪৫
  • ৩ বৈশাখ, ১৪৩১ (গ্রীষ্মকাল)
Raytahost Facebook Sharing Powered By : Sundarban IT