• আজ- রবিবার, ২১ জুলাই ২০২৪, ০৫:১৭ অপরাহ্ন
Logo

সুধা তরঙ্গের গল্প

সাজ্জাদ ফাহাদ / ৩৮৩ বার দেখা হয়েছে
আপডেট : শুক্রবার, ১৮ আগস্ট, ২০২৩

add 1
  • সাজ্জাদ ফাহাদ

শেষ রাতে দু:স্বপ্ন দেখার পর সে যে ঘুম ভাঙলো আর ঘুম হলো না। আমার পাশে একটা জীবিতা লাশ উল্টে পরে আছে। ইচ্ছা করছে তার পুন্দে একটা লাত্থি মেরে বিছানা থেকে ফেলে দেই। সারা রাত একটা টমটম চালু করে রাখে ৷ আঁধার কাটতেই বাহিরে এসে বসি আর মনে মনে গ্রামের বদমাস গুলোকে গালমন্দ করতে থাকি। মোল্লার গাছের কাঁঠাল চুরি করে খায় আর দানা গুলো তার ঘরের সামনে ছড়িয়ে রেখে যায়৷ পরে আমার ঘরের দোয়ারে এসে এক পোটলা পায়খানা করে যায়৷ বেয়াদবের গোষ্ঠীরা৷ মুরুব্বিরা বলতো সমাজের সব লোকের সরাসরি বিচার করতে নাই৷ মুরুব্বিদের সে কথা অমান্য করে আমি পরেছি মহা বিপদে। কেনো যে তাদের বিচার করতে গেলাম!
মিলন মিয়া দুধের বালতি নিয়ে তারাহুরো করে বাড়ির দিকে যাচ্ছে। জিজ্ঞেস করলাম- ও মিলন মিয়া, দুধ কতো কইরা বিক্রি করলা? কথার কোনো জবাব না দিয়েই মিলন মিয়া চলে গেলো। হাটতে হাটতে রাস্তার মোড়ে গেলাম৷ সবাই কেমন কানাকানি করছে৷ বিল্লাল ভাইয়ের দোকানের সামনে বহু লোকজন দেখা যাচ্ছে৷ সেদিকে যেয়ে দেখি একজনকে বেঁধে বেদম পেটানো হচ্ছে। আমাদের পাপ্পু ও আছে সেখানে৷ তাকেও দেখলাম লোকটাকে কয়েকটা কিল-ঘুষি মারতে। পাপ্পুকে জিজ্ঞেস করলাম, কি হয়েছেরে?
পাপ্পু বলল, জানিনা৷ সন্ধ্যায় খবর পেলাম মিলন মিয়া নাকি গত রাতে তার ঘরের দোয়ারে গুপ্তধন পেয়েছে৷ সারা গ্রামে এ খবর হাওয়ায় হাওয়ার ঘুরছে।

আশপাশে কেউ নেই। দূরের এক ঝোপে ব্যাঙ ডাকছে। জোনাকিরা উঁড়ে বেড়াচ্ছে। আমি ঘাটে বসে সিগারেট খাচ্ছি। হঠাৎ পেছন থেকে একটা হাত এসে আমার কাধের উপর পরে ৷ গভীর রাত। পাশেই বিশাল গোরস্থান ; সেখানে শত শত লোকের মরা দেহ পুতা, ঘুরে বেড়ায় আত্মা, আর এক গুচ্ছ কঙ্কাল। বুকের ভেতর মরমর করে কেপে উঠে। সারা দেহের লোম গুলো সজারুর কাটার মতো হয়ে যায়৷ ধীরে ধীরে পেছন ফিরে তাকাই। দেখি মিলন মিয়া। পরক্ষণেই আবার দেখি নিতু৷ মিলন মিয়াকে নিয়ে সারাদিন ভাবনায় পরে ছিলাম৷ এখন যেদিকেই তাকাই মনে হয় মিলন মিয়া গুপ্তধন হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। শালার কপাল! একই গ্রামের অন্যে পায় গুপ্তধন আর আমি ভোর সকালে উঠে দোয়ারে পাই এক পোটলা কাঁচা গু৷
নিতুকে নিয়ে বিছানায় চলে গেলাম। খোলা চোখ দুটো কখন যেনো বন্ধ হয়ে গেলো। আমি ঘুমিয়ে পরলাম৷ সাতটায় এলার্মের আওয়াজে ঘুম ভাঙলো৷ উঠে দেখি নিতু শাড়ি পরে ব্যাগ গোছাচ্ছ। আমাকে বললো ফ্রেস হয়ে আসতে নেত্রকোনা যাবে৷ আমি যাবো না বললেই সে রেগে যায়। পরিশেষে যেতে হচ্ছে। যাওয়ার পথে ট্রেনে করে যাবো। শাসনগাছা স্টেশন থেকে ট্রেনে উঠবো । আমরা আধ ঘন্টার মধ্যেই স্টেশনে পৌঁছে যাই। যাত্রী ছাউনির নিচে আমি নিতুর কোলে মাথা রেখে শুয়ে পরি।
নিতু বলল, এই আওয়াজে ঘুমাতে পারবে?
আমি বললাম, বিছানায় রোজি আমার কানের পাশে একটা হারমোনিয়াম বাজে। হারমোনিয়ামের আওয়াজ শুনে ঘুমিয়ে তো চার বছর পার করে দিয়েছি। এখন কোনো সমস্যা হবে না৷
নিতু কিছু বললো না৷ কিছুক্ষণ পর আমরা ট্রেনে উঠে বসি৷ ট্রেন চলতে শুরু করে। নিতু জানালার পাশ দিয়ে বসেছে। তার চুল গুলো উড়ছে। সে গুলো উড়ে এসে আমার মুখে লাগছে। আমার মনে পরে কলেজ জীবনের কথা৷ কলেজে থাকতে আমি অবন্তীকে নিয়ে রোজ বাসে করে আসা-যাওয়া করতাম। অবন্তী সব সময় জানালার পাশ দিয়ে বসতো। তখন তার চুল গুলোও এমন করে আমার মুখের উপর এসে লাগতো । নিতু তার ব্যাগ থেকে একটা বই বের করে। বইয়ের নামটা দেখা যাচ্ছে না। হয়তো বিদেশি কোনো লেখকের বই হবে ৷ সে আবার আমাদের দেশি লেখকদের বই পড়ে না৷ কিছুক্ষণ পর বইটা ব্যাগে রেখে নিতু আমার বাম হাতটা ধরে বলল, সাদা পাঞ্জাবিতে তোমায় ভালো মানিয়েছে।

নেত্রকোনা থেকেই খবর পেলাম মিলন মিয়া গায়েব হয়েছে৷ তাকে কোথাও খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। অবশ্য তাকে এখন গ্রামে খুঁজে না পাওয়াটা তেমন অস্বাভাবিক কিছু না৷ আমি যদি এখন এক লাখ টাকার একটা ব্যাগ পাই শ্বশুর বাড়ির কপালে উষ্ঠা মাইরা সোজা সমুদ্র সৈকতে চলে যাবো। আর সে তো গুপ্তধন পাইছে, সে কি করে গ্রামে থাকে! হয়তো ইউরোপ-আমেরিকা চলে গেছে।

অডিও গল্প শুনুন

যারা বিড়ি-সিগারেট খায় তাদের কাছে পৃথিবীর জাহান্নাম হলো শ্বশুর বাড়ি। সম্পূর্ণ পরাধীন রাষ্ট্র। সারাদিনে একটা সিগারেট খাওয়ার সুযোগ নেই। মাথা কেমন ভু-ভু করছে । রাত হলো তো গেলাম বাগানের দিকে। বাগানের দামরা মশা খায় আমার রক্ত আর আমি খাই ধোঁয়া। বাগান থেকে বেরিয়ে এসে বাহিরে চেয়ার পেতে বসলাম। পশ্চিমের আকাশে কালো মেঘের স্তর পরেছে। যখন তখন ঝমঝম করে বৃষ্টি নামতে পারে ৷ আমি ভাবছি, বৃষ্টি হলে ডোবা-নালার কৈ মাছ গুলো যেমন হাটি-হাটি পা-পা করে পাড়ে উঠে যায়, গুপ্তধন যদি এমন হাটি-হাটি পা-পা করে এসে আমায় দেখা দিতো! হঠাৎ পশ্চিমের আকাশ থেকে ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি নেমে আসলো। ফিরে গেলাম অতীতে; ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি নামলে দাদি জানের কাছে যেতাম আর দাদি জান কবিতা শুনাতো-
ঝমঝমিয়ে পরে বৃষ্টি
জাগে প্রেমের খেলা,
অকাল বৃষ্টির ঝাকুনিতে
ডুবে মাঝির ভেলা…..

টিনের চালে বৃষ্টির টুপটুপ আওয়াজ হচ্ছে৷ সবাই এক সাথে খেতে বসেছি। নিতু মিলন মিয়ার গুপ্তধনের ঘটনা বলে। আমি চুপচাপ শুনে যাচ্ছি তবে অন্যরা খুব আগ্রহ নিয়ে শুনছে৷ ঘটনা শেষ হতেই হাবু বলে, এই সব অনেকেই পায়৷ কেউ পাইয়া রাখতে পারে আবার কেউ পারে না৷ আমাগো গেরামের রশিদ মাস্টরের নাতিও এমন পাইছিলো। যে তারে এই ধনের সন্ধান দিছিলো সে শর্ত দিছে যাতে এই খবর দুনিয়ার কেউ না জানে ৷ তারে স্বপ্নে দেখাইছে অমুক জায়গায় আছে। স্বপ্ন দেখার সাথে সাথেই সে মাঝ রাতে সেই জায়গায় যাইয়া মাটি খুরছে। দশ হাত মাটির তলে যাইয়া পরে গুপ্তধন পাইছে। তার ভিতরে তো জ্বালাপোড়া। এমন বিষয় ক্যামনে গোপন রাখে! অল্প বয়সের পোলা, গোপন রাখতে না পাইরা তার মার কাছে কইলো। তার বাপ মইরা গেছে৷ তার মায় আবার কইলো তার নানারে৷ এর পরে তো বিষয় আর গোপন রইলো না৷ গুপ্তধনের খবর জানিনা ৷ তবে হেই পোলা এই ঘটনার পরে আর ভালা থাকতে পারে নাই৷ এহন পাগল হইয়া পথে পথে ঘুরে। পুলার আসল নাম কিডা জানি কিন্তু সবাই ডাকে হেঞ্জালা বইল্লা৷ তার মারে লইয়া আমাগো গেরামেই থাকে৷ সবাই তারে এক নামে চিনে, হেঞ্জালা পাগলা…
হাবুর কথা শুনতে শুনতে সকলের খাওয়া শেষ হলো। নিতু আমাকে বলল কাল বিকেলে আমাকে আর নুপুরকে নিয়ে সে এক জায়গায় ঘুরতে যাবে।আমার যেতে ইচ্ছা করছে না কিন্তু তারপরও আমি কিছু বললাম না৷ যাবো না বললে শ্বশুর বাড়ির লোকজন হয়তো ভাববে আমি কিপটে হয়ে গেছি। শ্বশুর বাড়ি দূর হওয়াতে এমনিতেও আসা-যাওয়া কম হয়। গত তিন বছরে এ নিয়ে দু’বার আসা হলো৷ নিতুকে ‘আচ্ছা’ বলে দিলাম।

পরদিন বিকেলে আমি, নুপুর আর নিতু বেরিয়েছি। পেছন পেছন ওদের পালা কুকুরটাও আসছে । কুকুরের নাম ‘ঘাওঘাও’। কুকুর দেখতে মরুভূমির উটের মতো। দেখেই মনে মনে সাধারণ ভাবে সমীকরণ করা যায়, {( বিদেশি কুকুর )^2 + দেশি কুকুর )}= ঘাওঘাও। নুপুর আমাদের কিছুটা সামনে হাটছে। হাটতে হাটতে আমরা যেয়ে স্থির হলাম এক পুরনো সৈয়দ বাড়ির সামনে । বাড়ির সামনে বিশাল গেইট, বিশাল এরিয়া। আমরা হাটতে হাটতে সৈয়দ বাড়ির ভেতরে ঢুকি। অনেক বড় বাড়ি। ভেতরে কক্ষের অভাব নেই। এ বাড়ির বয়স প্রায় তিন’শ বছর হবে ৷ নিতু বলল এ বাড়িটা নাকি ছিলো এক সময়ের জমিদার বাড়ির অংশ বিশেষ। এখান থেকে কিছুটা দূরেই জমিদার বাড়ি। এ বাড়ি ছিলো জমিদারের রাত্রি যাপনের স্থান। এ বাড়ির দেয়ালে মিশে আছে শত শত তরুণীর রক্ত, মুখবদ্ধ আওয়াজ…। জমিদার কখনোই রাতে বাড়ি ফিরতো না। রাতের পর রাত এ বাড়িতে কাটাতো ৷ জমিদার দিনে কখনো এ বাড়িতে ঢুলতো না। সন্ধ্যা হলেই সে কেবল এখানে আসতো। তখন এ বাড়িতে জমিদার আর জমিদারের কিছু ঘনিষ্ঠ লোকজন ছাড়া কেউ প্রবেশ করতে পারতো না। জমিদারের দু’জন ঘনিষ্ঠ লোক ছিলো ৷ তারা রোজ রাতে জমিদারকে চারজন করে কুমারী মেয়ে এনে দিতো। জমিদার এ বাড়িতে রোজ রাতে এক বিছানায় চারজন কুমারী মেয়েকে ভোগ করতো ৷ তাদের দেহের সুধা পান করে তাদেরকে নেংটা করে নাচতে বলা হতো ; জমিদার বিছানায় শুয়ে আফিম খেতো আর এ দৃশ্য দেখতো ৷ নাচের মাঝ খানে জমিদারের নির্দেশে তার ঘনিষ্ঠ লোকজন এসে সে মেয়েদের সাথে মিলিত হতো। জমিদার এ দৃশ্য দেখে আনন্দ নিতো। প্রভাত ঘনিয়ে এলেই জমিদার সকলের সামনে এক এক করে তিন জন মেয়েকে তার নিজ হাতে তার যৌবনের নামে বলি দিতো আর বাকি একজনকে মুক্ত করে দিতো। তারপর ভোরের পাখি জাগার আগেই জমিদার এ বাড়ি ছেড়ে যেতো৷
হঠাৎ একটা কক্ষের ভেতর আমার নজর যায়। সেখানে একটা লোক কি যেনো আগুনে পুড়ছে। অদ্ভুত রকমের এক লোক ; সাদা লম্বা চুল, মুখে লম্বা জটের দাঁড়ি, পড়নে হলুদ রঙের কাপড় পেচানো৷ আমি লোকটার কাছে এগিয়ে যাই। লোকটা ভারি গলায় আমাকে বলল, ‘বস এদিকে৷’ আমি বসলাম না, দাঁড়িয়েই রইলাম। নিতু আর নুপুর সামনে এগিয়েছে। তারা হয়তো আমাকে খুঁজছে। আমি দাঁড়িয়ে থাকাতে এবারে লোকটা আমার নাম ধরে বললো বসতে। আমি খুব অবাক হলাম; এই লোকটা আমার নাম জানলো কি করে! কখন যেনো বসে পরলাম৷ আমার মুখ থেকে কথা বেরোচ্ছে না। লোকটা আগুনের মধ্যে একটা কঙ্কালের হার পুড়ছে। আমি কিছু বুঝে উঠার আগেই লোকটা তার হাতের হারটাকে উচু করে বলল, ‘এটা আশুরের হাড্ডি।’ লোকটা তার হাতের হারের দিকে তাকিয়ে আমার ভেতরের সব কথা গরগর করে বলে দিচ্ছে। মনে হচ্ছে সে হারে আমার অতীত লেখা আছে, আমার মনের সব কথা অতিশয় নিখুঁত ভাবে লেখা আছে আর লোকটা গরগর করে সে লেখা গুলো পড়ে যাচ্ছে । আমি যে নুপুরকে পছন্দ করি এটাও সে বলে দিয়েছে। নিতুর আগে আমার আর একটা স্ত্রী ছিলো এ কথাও সে জানে ৷ সে আমার আরো অনেক গোপন তথ্য দিয়েছে, যেগুলো তার মোটেও জানার কথা না৷ নিতুকে বিছানায় রেখে আমি গতকাল তার বিধবা চাচির বিছানায় গিয়েছি এ কথাও এ লোকের জানা৷ এতোক্ষণ লোকটা আমাকে কিছু বলার মতো সুযোগ দিচ্ছিলো না৷ যখনি সুযোগ দিলো আমি কিছু একটা বলতে যাবো তখনই সে উধাও। এদিক সেদিক তাকিয়ে দেখি কেউ নেই। এলোপাতাড়ি এক দৌড়ে সৈয়দ বাড়ির বাহিরে চলে আসি।
আমার মাথায় এখন সারাক্ষণ শুধু সে লোকটা ঘুরপাক খায় । আমি যাই করি মনে হয় সে লোকটা দূর থেকে আমাকে দেখছে। রাত হলে আমি নিতুকে ছোতে গেলেই মনে হয় সে লোকটা এসে চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে আমাদের সব দেখছে। আমি লোকটার ব্যাপারে কাউকে কিছু বলিনি, ভেবেছি বলবো ও না। সেদিন রাত পেরিয়ে ভোর হতেই আমি নিতুকে নিয়ে নেত্রকোনা থেকে ফিরে আসি আমার নিজ গ্রামে।

স্থান পরিবর্তন করেছি কিন্তু ভেতর থেকে সে লোকটাকে এখনো সরাতে পারিনি। লোকটা আমার ডায়রির পঞ্চান্ন নম্বর পাতার কবিতাটার কথাও বলেছিলো। আমি খুব করে লোকটাকে ভুলতে চাচ্ছি কিন্তু পারছিনা। লোকটাকে ভুলার জন্য আমি বাড়ি ফিরে ডায়রি থেকে সে পাতাটা ছিড়ে ফেলি। পাতাটাকে আমি এখন কুচি-কুচি করে পানিতে ফেলে দেবো । পাতাটাকে ধ্বংসের পূর্বে আমি শেষবার তাকে পড়ে নেই-
নুপুরের পায়ে নুপুর ঝুমুর ঝুমুর করে ;
এক নজরে চেয়ে আছি-
আমি কিছুটা দূরে।
নুপুর পায়ে হাটছে নুপুর
মুচকি করে হাসে,
তার হাসিতে সুধা তরঙ্গ স্রোতের ভীরে আসে।
নুপুর তোমার হাসির মাঝে
সুধার তরী ভাসে;
ইচ্ছা করে আঁধার রাতে পাইতে তোমায় কাছে।

রাত গভীর হয়েছে কিন্তু ঘুম আসছে না। একবার এদিক ফিরে শুই তো আরেকবার ওদিক ফিরে শুই। দরজায় বাহিরে থেকে ঠকঠক আওয়াজ আসে। আমি যেয়ে দরজা খুলে দেখি সৈয়দ বাড়ির সেই অদ্ভুত লোকটি আশুরের হাড্ডি হাতে দাঁড়িয়ে আছে৷ তার মধ্যে আজ সেদিনের মতো তেজ দেখছি না। সে আমার কাছে খাবার চাইলো। আমি তাকে খেতে দিলাম। নিমিষেই দু ‘ প্লেট ভাত খেয়ে ফেললো। খাওয়া শেষে লোকটা তার হাতের হাড্ডি দিয়ে ইশারা করে একটা জায়গা দেখিয়ে বলল, তুই যার অপেক্ষাতে আছিস সেখানে সে আছে। সাথে সাথেই আমার ঘুম ভেঙে যায় ৷ মনে সুখের বন্যা বইছে। ভাবলাম কপাল বোধহয় খুলে গেছে। সেখানে গেলেই পেয়ে যাবো শখের গুপ্তধন। তারাহুরো করে ঘর থেকে বেরিয়ে সেখানটাতে গেলাম। যেয়ে দেখি পিছা মারা কপালের ধন; কোনো একজনের পোটলা করা কাঁচা গুবর। মেজাজ মারাত্মক খারাপ হলো। জিপিএ ফাইভের আশা করে মেরেছে ফেইল ; আমার হলো সেই দশা।

আমি নাকি নিতুর সাথে ইদানিং খুব খারাপ আচরণ করি। গত রাতে নাকি তাকে গলা টিপে ধরে বলছিলাম ‘মর মাগী মর’। কিন্তু আমার এসবের কিছুই মনে পরছে না৷ নিতুর কথা গুলোকে সম্পূর্ণ অহেতুক নিরর্থ মনে হচ্ছে। কিছুই বিশ্বাস হচ্ছে না। নিতু আমার সাথে রাগ করে আবার নেত্রকোনা চলে গেছে। যাওয়ার আগে বলে গেছে আর ফিরবে না।
বাড়িতে নিতু নেই৷ একলা ঘরে খুদার যন্ত্রণায় ভুগছি৷ পাশের ঘর থেকে যেয়ে খাবার খুঁজে আনবো সেটাও পারছি না। চুপচাপ ঘরের দরজা আটকে বসে আছি৷ বাহিরে বেরোতে ভালো লাগছে না৷ আবার একা থাকতেও ভালো লাগছে না। বারবার শুধু সৈয়দ বাড়ির সে অদ্ভুত লোকটার কথা মনে পরছে। ভিশন অস্থির লাগছে। কি করবো বুঝে উঠতে পারছিনা৷ সৈয়দ বাড়ির লোকটা আবার এসেছে। দরজা জানালা সব বন্ধ, কোন দিক দিয়ে ঢুকেছে! লোকটাকে মারাত্মক বিরক্ত লাগছে। তার চেহারাটা দেখতে ইচ্ছা করছে না ৷ ইচ্ছা করছে কাঁচা গু এনে তার মুখে মেখে দিতে। লোকটা অদ্ভুত ভঙ্গিতে আমার মুখের দিকে তাকিয়ে থেকে বিছানার উপরে একটা কাগজ রেখে উধাও হয়ে যায়। আমি ভয়ে ভয়ে কাগজের ভাজটা খুলে দেখি এখানে কিছু অস্পষ্ট লেখা রয়েছে; এসব লেখা পড়ার মতো অবস্থায় নেই৷ তারপর কাগজটাকে উড়া মেরে মেঝেতে ফেলে দেই । তারাহুরো করে দরজা-জানালা সব খুলে দেই। হাটতে হাটতে রাস্তায় বেরোই৷

বাড়ি ফিরতে ফিরতে রাত হয়ে গেছে। বিল্লাল ভাইয়ের দোকানের সামনে রেখে যে লোকটাকে সেদিন কিল-ঘুষি মারা হলো সে লোকটা মারা গেছে। তার পরিবারের লোকজন কয়েকজনের নামে থানায় মামলা করেছে। সেখানে পাপ্পুর নামও আছে। সে সব বিষয়াদি নিয়েই এতোক্ষণ কথাবার্তা বললাম। পেটে খুদা থাকলে অন্যের বিষয় নিয়ে সমালোচনা করা দরকার। তাতে খুদার কথা আর মনে থাকে না। এটা আমার আবিষ্কার। ঘরে ঢুকে মেঝে পরে থাকা কাগজটাকে আবার হাতে নিলাম। চেয়ে দেখি কাগজটার অস্পষ্ট লেখা গুলো স্পষ্ট হয়ে উঠেছে! এটা কি তবে সেই হিন্দুস্থানের জাদুবিদ্যা নামক বইয়ের পাতা! যে বইয়ের সাথে মিশে আছে সম্রাট হুমায়ুনের ইতিহাস। হুমায়ুন ছিলেন একজন সংস্কৃতি প্রেমিক সম্রাট। বই পড়া, শের আবৃতি, শের রচনা, ছবি আকার প্রতি ছিলো তার অব্যক্ত নেশা। হুমায়ুন এ বইটির জন্য দীর্ঘ অপেক্ষা করেছেন এবং এক সময় জানতে পেরেছিলেন বইটি এখন তার ভাই কামরাম মির্জার কাছে আছে। কামরান মির্জা এ বই সংগ্রহ করেছে কান্দাহার নামের এক দুর্গ থেকে৷ হুমায়ুন বইটি পড়ার জন্য তার ভাই কামরান মির্জার কাছ থেকে বইটি চেয়ে চিঠি লিখেছিলো কিন্তু তার ভাই সে চিঠির কোনো ফলাবর্তন করেননি। এ নিয়ে হুমায়ুনের মনে কিছুটা আঘাত লাগে। এ বইয়ের প্রতি হুমায়ুনের আগ্রহ জাগার কারণ হলো তিনি জানতে পেরেছিলেন এ বইটি নাকি প্যাচার রক্তে লেখা। দিনের আলোতে এর লেখা অস্পষ্ট থাকে এবং রাতে লেখা স্পষ্ট হয়৷ মূলত এ কারণেই হুমায়ুন এ বইটি পড়তে আগ্রহী হয়। মোঘল ইতিহাসে সম্রাট হুমায়ুনকে, শের খাঁ এই বই উপহার দিয়ে তাকে বইয়ের নেশায় ফেলে সে হুমায়ুনকে পরাজিত করেছিলো। আমি কি তবে সেই ঐতিহাসিক বইয়ের পাতা পেয়েছি! লোকটা কি তবে হিন্দুস্থানের জাদুবিদ্যা নামক বইয়ের একটি পাতা আমাকে উপহার হিসেবে দিয়ে গেলো! নাকি সেদিন স্বপ্নে তাকে ভাত খেতে দিয়েছিলাম বলে আজ সে এ উপহার দিয়ে তার ঋণ সুধ করলো? আমি লেখা গুলোকে পড়তে চাইলাম কিন্তু পারলাম না। এ বর্ণ গুলোর সাথে আমার কোনো পরিচয় নেই। এবারে আমি নিশ্চিত হলাম এটা অবশ্যই হিন্দুস্থানের জাদুবিদ্যা নামক বইয়ের পাতা। কারণ, এ বই লেখা হয়েছিলো প্রাচিন সংস্কৃত ভাষায়। হুমায়ুন বইটিকে এক পন্ডিতের মাধ্যমে ফারসি ভাষায় অনুবাদ করিয়ে নিয়েছিলেন। হঠাৎ বাহিরে থেকে চিৎকার আসে, ও আল্লহ্ গো…
আমি তারাহুরো করে ঘর থেকে বেরিয়ে দেখি মানুষজনের ছুটাছুটি শুরু হয়েছে। কিছু না বুঝে আমিও তাদের সাথে ছুটতে লাগলাম। যেতে যেতে মিলন মিয়ার বাড়িতে গিয়ে পৌঁছালাম। তার বাড়ির আঙিনায় পুরনো এক মান্দার গাছে সে ঝুলে আছে। কেউ তাকে ছোতে সাহস করছে না৷ সবার ধারনা পেত্নী তার এই হাল করেছে। তাকে যে ছোবে তার উপরেও পেত্নীর বদ নজর পরবে। কেউ পেত্নীর বদ নজরের শিকার হতে চায় না। আমার পাশে নেছা মিয়া খালি গায়ে গলায় গামছা বেঁধে দাঁড়িয়ে আছে।
বদমাইশ্শা মানুষ! পেত্নির বদ নজরে পরতে চায় না, অথচ ইমাম সাবের বদ নজরের কথা কারোই মনে থাকে না। প্রতি শুক্রবারে ইমাম সাবরে বারো মিনিটে তেরো কথা হুনায় । এইডাই কেয়ামতের আলামত।
এ বলে নেছা মিয়া চলে যায়।

বাড়ি ফিরে টেবিলের উপরে রেখে যাওয়া কাগজের পাতাটা হাতে নিলাম। ওমা! বড়ই অবাক করা কান্ড! এখন চেয়ে দেখি এ পাতা বাংলা ভাষায় লেখা। সারা গা স্পন্দিত হতে শুরু করেছে। ভয়ে হাত থেকে পাতাটা মেঝেতে ঝারি মেরে ফেলে দেই। আমার শ্বাসকষ্ট বেড়ে গেছে। বেহুশের মতো অবস্থা। চারপাশ আইন্ধার হয়ে আসছে। পাতাটা বাঙালির মতো খাটি বাংলায় কথা বলতে থাকে :
আপনি আমার কথা শুনে ভয় পাবেন না ; শান্ত হোন। নিরব হয়ে বসুন। এক গ্লাস পানি খেয়ে নিন। আমি আপনার শত্রু নয়। আপনার সাথে গল্প করতে চাই। গল্পের নাম, সুধা তরঙ্গের গল্প। বিশাল নদী ; সেখানে এক তরুণী…

 

লেখকের অন্যান্য সব লেখা পড়ুন

add 1


আপনার মতামত লিখুন :

2 responses to “সুধা তরঙ্গের গল্প”

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

অন্যান্য লেখা সমূহ

আজকের দিন-তারিখ

  • রবিবার (বিকাল ৫:১৭)
  • ২১ জুলাই, ২০২৪
  • ১৪ মহর্‌রম, ১৪৪৬
  • ৬ শ্রাবণ, ১৪৩১ (বর্ষাকাল)
Raytahost Facebook Sharing Powered By : Sundarban IT