• আজ- বৃহস্পতিবার, ২৯ ফেব্রুয়ারী ২০২৪, ১২:২৭ অপরাহ্ন
Logo

জহির রায়হান

লেখক : / ২৬৫ বার দেখা হয়েছে
আপডেট : শনিবার, ১৯ আগস্ট, ২০২৩
‘জীবন থেকে নেয়া’র স্রষ্টা জহির রায়হানের জন্মদিন
‘জীবন থেকে নেয়া’র স্রষ্টা জহির রায়হানের জন্মদিন

add 1

বাংলা সাহিত্য ও চলচ্চিত্রের কালজয়ী এক পথিকৃতের নাম জহির রায়হান। প্রগতিশীল ও প্রতিবাদী সাহিত্য চর্চা করতে করেতই একসময় তিনি চলচ্চিত্রকে মাধ্যম হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন। পরবর্তীতে চলচ্চিত্রই হয়ে ওঠে তার ধ্যান-জ্ঞান। জহির রায়হান এককথায় বাংলাদেশের একজন প্রখ্যাত চলচ্চিত্র নির্মাতা, ঔপন্যাসিক এবং গল্পকার।

তিনি বাঙালির এক প্রবাদ পুরুষ। সংস্কৃতি ও রাজনীতি অঙ্গনের এই কৃতি পুরুষের মূল পরিচয় সাহিত্যিক ও চলচ্চিত্রকার। রাজনৈতিক আদর্শে বিপ্লবে বিশ্বাসী ছিলেন বাঙালির এই বীর সন্তান। তিনি একজন মুক্তিযোদ্ধা, ভাষাসৈনিক, সাংবাদিক- সর্বোপরি একজন প্রতিবাদী মানুষ; যিনি ঐতিহ্যকে লালন করেছিলেন নিজের বিশ্বাসে বলীয়ান থেকে।

আজ ১৯ আগস্ট জাতির এই সূর্যসন্তানের ৮৮তম জন্মদিন। ১৯৩৫ সালের এই দিনে তিনি ফেনী জেলার মজিপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা মওলানা মোহাম্মদ হাবিবুল্লাহ কলকাতা আলীয়া মাদ্রাসার অধ্যাপক এবং ঢাকা আলীয়া মাদ্রাসার অধ্যক্ষ ছিলেন। জহির রায়হানের প্রকৃত নাম মোহাম্মদ জহিরউল্লাহ। তার ডাক নাম ছিল জাফর। ছোট বেলাতেই তিনি রাজনীতির সংস্পর্শে আসেন।

বড় ভাই শহীদুল্লাহ কায়সার ও বড় বোন নাফিসা কবির বাম ধারার রাজনীতির সাথে যুক্ত ছিলেন। তাদের কাছ থেকেই জহির রায়হানের বামপন্থী চিন্তা-চেতনায় দীক্ষিত হন। তিনি কলকাতায় মিত্র ইনিস্টিউটে এবং পরে আলীয়া মাদ্রাসায় অধ্যয়ন করেন। ভারত বিভাগের পর তিনি তার পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে নিজ গ্রামে চলে যান। ১৯৫০ সালে তিনি আমিরাবাদ উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ম্যাট্রিক পাস করেন এবং ঢাকায় এসে কলেজে ভর্তি হন।

একটা সময় ঢাকায় ভাষা আন্দোলনের দ্বিতীয় পর্বের সূচনা হয়। তিনি সচেতনভাবে যুক্ত হন ভাষা আন্দোলনের সাথে। ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি আমতলা বৈঠকের সিদ্ধান্ত মোতাবেক যে ১০ জনের দলটি প্রথম ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে গ্রেপ্তার হন, জহির রায়হান ছিলেন তাদের অন্যতম। ১৯৫৮ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলায় স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন।

এরই মধ্যে ১৯৫২ সালে তিনি ফটোগ্রাফি শিখতে কলকাতা গমন করেন এবং প্রমথেশ বড়ুয়া মেমোরিয়াল স্কুলে ভর্তি হন। ১৯৫৬ সালে তিনি চলচ্চিত্রে প্রবেশ করেন। ১৯৬১ সালে তার পরিচালিত প্রথম চলচ্চিত্র কখনও আসেনি মুক্তি পায়। তারপর একের পর এক তার নির্মিত চলচ্চিত্র মুক্তি পেতে থাকে। নিপুণ দক্ষতার সাথে চলচ্চিত্র নির্মাণ শিল্পে খুব অল্প সময়ে নিজেকে বিকাশিত করেন জহির রায়হান। তার নির্মিত মুক্তিযুদ্ধ ভিত্তিক প্রামাণ্য চিত্রগুলো যুদ্ধকালীন সময়ে বিশ্বমানবতার টনক নাড়িয়ে দেয়।

জহির রায়হানের নির্মিত চলচ্চিত্রগুলো হলো- কখনো আসেনি (১৯৬১), সোনার কাজল (১৯৬২), কাঁচের দেয়াল (১৯৬৩), সংগ্রাম (১৯৬৪ তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের সর্বপ্রথম রঙিন চলচ্চিত্র), বাহানা (১৯৬৫), বেহুলা (১৯৬৬), আনোয়ারা (১৯৬৬), দুই ভাই (১৯৬৮), জীবন থেকে নেয়া (১৯৬৯) ও ইংরেজি ভাষায় Let There Be Light। ১৯৫৫ সালে তার প্রথম গল্পগ্রন্থ সূর্যগ্রহণ ও ১৯৬০ সালে প্রথম উপন্যাস শেষ বিকেলের মেয়ে প্রকাশিত হয়।

পেশাগত জীবনে তিনি সাংবাদিকতা ও চলচ্চিত্র সাংবাদিকতার সাথে সরাসরি জড়িত ছিলেন। ১৯৫০ সালে ‘যুগের আলো’ পত্রিকা দিয়ে তিনি সাংবাদিকতার সাথে যুক্ত হন ও পরবর্তীতে বিভিন্ন পত্রিকায় সাংবাদিকতা করেন। তিনি ১৯৭০ সালে প্রকাশিত ইংরেজি পত্রিকা দ্য উইকলি এক্সপ্রেস প্রকাশের উদ্যোক্তাদের অন্যতম। এ ছাড়া তিনি কতিপয় সাহিত্য পত্রিকার সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন।

উল্লেখ্য, ১৯৫৬ সালে ‘প্রবাহ’ পত্রিকায় জহির রায়হান সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৬৪ সালে তিনি পাকিস্তানের প্রথম রঙিন চলচ্চিত্র ‘সঙ্গম’ নির্মাণ করেন (উর্দু ভাষার সিনেমা) এবং পরের বছর তার প্রথম সিনেমাস্কোপ চলচ্চিত্র ‘বাহানা’ মুক্তি দেন। ব্যক্তিগত জীবনে জহির রায়হান ১৯৬১ সালে সুমিতা দেবীকে এবং ১৯৬৬ সালে তিনি সুচন্দাকে বিয়ে করেন। দু’জনেই ছিলেন সে সময়কার বিখ্যাত চলচ্চিত্র অভিনেত্রী। শমী কায়সার জহির রায়হানের বড় ভাই শহীদুল্লাহ কায়সারের কন্যা।

তিনি ‘লেট দেয়ার বি লাইট’ নামে একটি ইংরেজি সিনেমা নির্মাণ শুরু করেন। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধ শুরু হওয়ায় তিনি তা শেষ করতে পারেননি। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে তিনি কলকাতায় চলে যান এবং সেখানে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে প্রচারাভিযান ও তথ্যচিত্র নির্মাণ শুরু করেন।

সেখান থেকে পাকিস্তানি সামরিক জান্তার গণহত্যার চিত্র সম্বলিত ‘স্টপ জেনোসাইড’ নির্মাণ করেন। সিনেমাটি পৃথিবীজুড়ে আলোড়ন সৃষ্টি করে। সে সময়ে তিনি চরম অর্থনৈতিক দৈন্যতার মধ্যে থাকা সত্ত্বেও তার চলচ্চিত্র প্রদর্শনী থেকে প্রাপ্ত সমুদয় অর্থ তিনি মুক্তিযোদ্ধা তহবিলে দান করেন।

জহির রায়হানের চিন্তা চেতনা ছিল ভিন্নতর। প্রকৃত পক্ষে তিনি ছিলেন একজন নাগরিক লেখক। নগরকেন্দ্রিক ঘটনাবলী ছিল তার উপন্যাসের মূল উপজীব্য। ছাত্রজীবনেই তিনি লেখালেখিতে আগ্রহ প্রকাশ করেন। লেখক হিসেবে জহির রায়হানের জনপ্রিয়তাও ছিল তুঙ্গে। সাতটি উপন্যাসের মধ্যে কেবলমাত্র ‘হাজার বছর ধরে’ ছাড়া অন্য সবের পটভূমি শহর বা নগর।

১৩৬২ বঙ্গাব্দে তার প্রথম গল্পসংগ্রহ সূর্যগ্রহণ প্রকাশিত হয়। ‘হাজার বছর ধরে’ উপন্যাসের মধ্যে যেভাবে তিনি আবহমান বাংলার স্বকীয়তা ও ধারাবাহিকতাকে বেঁধেছেন, এক কথায় তা অসামান্য। বাংলা সাহিত্যে এমন কালজয়ী উপন্যাস খুব বেশি নয়।

ভাষা আন্দোলনের পটভূমিতে জহির রায়হানের লেখা ‘একুশে ফেব্রুয়ারি’ ও ‘আরেক ফাল্গুন”’ নামক উপন্যাস দুটি তার অনবদ্য রচনা। এছাড়াও উল্লেখযোগ্য গ্রন্থাবলীর মধ্যে রয়েছে- ‘সূর্যগ্রহণ’, ‘শেষ বিলেকের মেয়ে’, ‘হাজার বছর ধরে’, ‘আর কতদিন’, ‘কয়েকটি মৃত্যু’, ‘বরফ গলা নদী’, ‘তৃষ্ণা’ প্রভৃতি।

জহির রায়হানের উর্দু সিনেমা সঙ্গম ছিল পাকিস্তানের প্রথম রঙ্গিন সিনেমা। তার অপর উর্দু সিনেমা বাহানা ছিল সিনেমাস্কোপ। ‘হাজার বছর ধরে’ উপন্যাসের জন্য ১৯৬৪ সালে ‘আদমজী পুরস্কার’ পান জহির রায়হান। ১৯৭২ সালে তাকে বাংলা একাডেমি পুরস্কার (মরণোত্তর) এবং ১৯৭৭ সালে একুশে পদকে ভূষিত করা হয়। এছাড়া শ্রেষ্ঠ বাংলা সিনেমা হিসেবে ‘কাচের দেয়াল’ চলচ্চিত্রের জন্য তিনি ‘নিগার পুরস্কার’ লাভ করেন।

১৯৭১ সালে জহিরের জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা প্রখ্যাত লেখক শহীদুল্লা কায়সারকে অজ্ঞাতনামা দুর্বৃত্তরা তার বাস ভবন থেকে তুলে নিয়ে যায়। ১৯৭১ সালের ৩০ ডিসেম্বর তিনি খবর পান যে, শহীদুল্লা কায়সারকে ঢাকার মিরপুরে রাখা হয়েছে। তিনি তাকে উদ্ধারের জন্য সেখানে যান। কিন্তু তিনি আর ফিরে আসেননি।

তার অন্তর্ধানের দীর্ঘ আটাশ বছর পর্যন্ত তাকে অপহরণ করে গুম করে ফেলার খবর প্রচার করা হলেও পহেলা সেপ্টেম্বর ১৯৯৯ দৈনিক ভোরের কাগজের এক রিপোর্টে বেরিয়ে আসে জহির রায়হান খুনের আসল রহস্য। এরই মধ্য দিয়ে পুরো জাতি জানতে পারে ১৯৭২ সালের ৩০শে জানুয়ারি বাংলার এই উজ্জ্বল নক্ষত্রকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছিল।

জহির রায়হান আজও স্মরণীয়, বরণীয় এবং বাঙালির স্মৃতিপটে অম্লান। তিনি প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে আজন্মের আলোকবর্তিকা; শিল্প-সৃজনে অনুপ্রেরণার এক সূতিকাগার। তার অনবদ্য সৃজনালোয়ে তিনি উজ্জ্বল হয়ে বেঁছে থাকবেন বাঙালির স্মৃতি-সত্তায়।

add 1


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

অন্যান্য লেখা সমূহ

আজকের দিন-তারিখ

  • বৃহস্পতিবার (দুপুর ১২:২৭)
  • ২৯ ফেব্রুয়ারি, ২০২৪
  • ১৮ শাবান, ১৪৪৫
  • ১৬ ফাল্গুন, ১৪৩০ (বসন্তকাল)
Raytahost Facebook Sharing Powered By : Sundarban IT