• আজ- সোমবার, ২৬ ফেব্রুয়ারী ২০২৪, ০৪:২৪ পূর্বাহ্ন
Logo

আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো

লেখক : / ২৭ বার দেখা হয়েছে
আপডেট : বৃহস্পতিবার, ৮ ফেব্রুয়ারি, ২০২৪
২১

add 1

মাতৃভাষা বাংলাকে নিয়ে কবি সিকানদার আবু জাফর তাঁর ‘একুশে ফেব্রুয়ারি’ কবিতার শেষ লাইনগুলোতে লিখেছেন ‘অতীতের কোন নির্বাক একদার/দেশের লোকের গর্ব-গৌরবের/অশ্রু এবং রক্ত দানের/ক্ষ’য়ে ঝ’রে-যাওয়া প্রেরণা মূল্য/নিখিল জীর্ণ নিষ্প্রভ ইতিহাস/একুশে ফেব্রুয়ারি।’ কবি সাহিত্যিকরা মায়ের ভাষায় সেই সময় থেকেই অজস্র সাহিত্য রচনা করে আসছেন। রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের পক্ষে ১৩ ফেব্রুয়ারি জোরালো বক্তব্য রাখার কারণে ‘ক্ষছঙ্গ’ পত্রিকাটি নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়। পত্রিকাটি ১৯৫২ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি প্রধানমন্ত্রী নাজিমুদ্দীন সম্পর্কে এক সম্পাদকীয় প্রকাশ করেছিল। ওই সম্পাদকীয়তে বলা হয়েছিল- ‘ইসলামের তৃতীয় খলিফা অত্যন্ত ধার্মিক ও সৎলোক ছিলেন। কিন্তু নির্লজ্জ আত্মীয়তোষণের অপরাধে অপরাধী ছিলেন। তার আত্মীয়স্বজন ও বন্ধুবান্ধব যাদের দাবি আদৌ বিবেচনার যোগ্য ছিল না। তিনি তাদেরই নানারূপ ক্ষমতার অধিকারী করেছিলেন। খাজা নাজিমুদ্দীন ধার্মিক মুসলমান এ কথা কেউই অস্বীকার করবেন না, কিন্তু তিনি যেন নিজেকে দ্বিতীয় ওসমান-বিন-আফফান প্রমাণিত না করেন আমরা এ আশা এবং এ প্রার্থনাই করি।’ এ সম্পাদকীয় প্রকাশের পর পত্রিকার সম্পাদক আব্দুস সালাম ও প্রকাশক হামিদুল চৌধুরীকে গ্রেফতার করা হয়। এমএ বার্ণিক রচিত ‘রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের ইতিহাস’-ঘটনাপ্রবাহ ও পরিপ্রেক্ষিত বিশ্লেষণ’ গ্রন্থে এমন তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে। ভারতীয় উপমহাদেশে ব্রিটিশশাসিত অঞ্চলগুলো ১৯৪৭ এবং ১৯৪৮ সালে স্বাধীনতা লাভ করে চারটি সার্বভৌম রাষ্ট্রে পরিণত হয়। ভারত, বার্মা (বর্তমান মিয়ানমার), সিংহল (বর্তমান শ্রীলঙ্কা) এবং পাকিস্তান (যার মধ্যে পূর্ব পাকিস্তানও অন্তর্ভুক্ত ছিল, যা অধূনা বাংলাদেশ নামে পরিচিত)। ১৯৪৭ সালে ভারত ভাগের পর পূর্ব পাকিস্তানের (পূর্ববাংলা হিসেবেও পরিচিত) বাংলাভাষী ৪ কোটি ৪০ লাখ মানুষ ৬ কোটি ৯০ লাখ জনসংখ্যাবিশিষ্ট নবগঠিত পাকিস্তানের নাগরিকে পরিণত হয়। কিন্তু পাকিস্তান সরকার, প্রশাসন এবং সামরিক বাহিনীতে পশ্চিম পাকিস্তানীদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা ছিল। একই সালে করাচীতে অনুষ্ঠিত জাতীয় শিক্ষা সম্মেলনের একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণাপত্রে উর্দুকে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা হিসেবে ব্যবহারের সুপারিশসহ প্রচারমাধ্যম ও বিদ্যালয়ে কেবলমাত্র উর্দু ব্যবহারের প্রস্তাব করা হয়। তাৎক্ষণিকভাবে পূর্ব বাংলায় এ প্রস্তাবের বিরোধিতা ও প্রতিবাদের ঝড় ওঠে। পূর্ব বাংলায় রাষ্ট্রভাষা বাংলাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা এবং পূর্ব পাকিস্তানে শিক্ষার মাধ্যম হিসেবে ব্যবহারের প্রবল দাবি উত্থাপন করা হয়। পাকিস্তান পাবলিক সার্ভিস কমিশন বাংলাকে তাদের অনুমোদিত বিষয় তালিকা থেকে বাদ দেয় ও সঙ্গে সঙ্গে মুদ্রা এবং ডাকটিকেট থেকেও বাংলা অক্ষর বিলুপ্ত করে। কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ফজলুর রহমান মালিক উর্দুকে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা বানানোর জন্যে ব্যাপক প্রস্তুতি গ্রহণ করেন। পূর্ব পাকিস্তানে ব্যাপক ক্ষোভের সৃষ্টি হয় এবং ১৯৪৭ সালের ৮ ডিসেম্বর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে ছাত্রদের একটি বিশাল সমাবেশে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা দানের আনুষ্ঠানিক দাবি জানানো হয়। সেই সময় পূর্ব বাংলার নেতৃস্থানীয় বাঙালী প-িতগণ উর্দুকে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার বিপক্ষে মত দেন। পাকিস্তানের কোন অংশেই উর্দু স্থানীয় ভাষা ছিল না বলে উল্লেখ করেছেন ভাষাবিদ মুহম্মদ শহীদুল্লাহ। তিনি বলেছিলেন যে, ‘আমাদের যদি একটি দ্বিতীয় রাষ্ট্রভাষা নির্ধারণ করার প্রয়োজন হয়, তবে আমরা উর্দুর কথা বিবেচনা করতে পারি। সাহিত্যিক আবুল মনসুর আহমেদ বলেছেন, উর্দুকে যদি রাষ্ট্রভাষা করা হয় তবে পূর্ব পাকিস্তানের শিক্ষিত সমাজ নিরক্ষর এবং সব সরকারী পদের ক্ষেত্রেই অনুপযুক্ত হয়ে পড়বে। ১৯৪৭ সালের ডিসেম্বরের শেষেরদিকে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার সমর্থনে প্রথম রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ গঠন করা হয়। তমদ্দুন মজলিশের অধ্যাপক নূরুল হক ভূঁইয়া এ কমিটির আহ্বায়ক ছিলেন। পরবর্তীতে সংসদ সদস্য সামসুল হক আহ্বায়ক হয়ে নতুন কমিটি গঠন করেন এবং বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার পক্ষে কার্যক্রম আরও জোরদার করেন। ১৯৪৮ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি তারিখে পাকিস্তান গণপরিষদে ইংরেজী ও উর্দুর পাশাপাশি সদস্যদের বাংলায় বক্তৃতা প্রদান এবং সরকারী কাজে বাংলা ভাষা ব্যবহারের জন্য একটি সংশোধনী প্রস্তাব উত্থাপন করেন গণপরিষদ সদস্য ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত। ইংরেজীতে প্রদত্ত বক্তৃতায় বাংলাকে অধিকাংশ জাতিগোষ্ঠীর ভাষা হিসেবে উল্লেখ করে ধীরেন্দ্রনাথ বাংলাকে রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা দেয়ার দাবি তোলেন। এ ছাড়াও সরকারী কাগজে বাংলা ভাষা ব্যবহার না করার সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ জানান তিনি। সংসদ সদস্য প্রেমহরি বর্মন, ভূপেন্দ্র কুমার দত্ত এবং শ্রীশচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় তাঁর এ প্রস্তাবকে স্বাগত জানান। তাঁরা পূর্ব পাকিস্তান থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্য ছিলেন এবং তাঁদের এ সমর্থনের মাধ্যমে মূলত পূর্ব পাকিস্তানের স্বাভাবিক মতামতই প্রতিফলিত হয়েছিল। তমিজুদ্দিন খানের নেতৃত্বে পরিষদের সব মুসলমান সদস্য (সবাই মুসলিম লীগের) একযোগে এ প্রস্তাবের বিরোধিতা করেন। খাজা নাজিমুদ্দিন এ প্রস্তাবের বিরোধিতা করে বক্তৃতা দেন। তিনি বলেন যে, ‘পূর্ব বাংলার অধিকাংশ মানুষ চায় রাষ্ট্রভাষা উর্দু হোক।’ পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খান এ প্রস্তাবটিকে পাকিস্তানে বিভেদ সৃষ্টির অপচেষ্টা বলে উল্লেখ করেন। উর্দুকে লক্ষ কোটি মুসলমানের ভাষা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা কেবলমাত্র উর্দুই হতে পারে।’ অনেক বিতর্কের পর সংশোধনীটি ভোটে বাতিল হয়ে যায়। সংসদীয় দলের আপত্তির কারণে অনেক বাঙালী মুসলমান সদস্য ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত উত্থাপিত সংশোধনীটিকে সমর্থন করতে পারেননি। গণপরিষদের ঘটনার প্রথম প্রতিক্রিয়া শুরু হয় ঢাকায়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ ও জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় তৎকালীন জগন্নাথ কলেজ ছাত্রদের মিছিল কর্মসূচী ছিল। এ উদ্যোগে শহরের অধিকাংশ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ছাত্ররা ক্লাস বর্জন করে। ধর্মঘট ঘোষিত হয় এবং ওইদিন সমগ্র পূর্ব পাকিস্তানে প্রতিবাদ দিবস ও ধর্মঘট পালন করা হয়। সরকারের প্ররোচনায় পুলিশ মিছিলে লাঠিচার্জ করে অনেক নেতাকর্মীকে গ্রেফতার করে। তমদ্দুন মজলিস ওই সময়ে বিশেষ ভূমিকা পালন করে। ২ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফজলুল হক হলে ছাত্র বুদ্ধিজীবীদের এক সমাবেশ ঘটে। ওই সভায় দ্বিতীয়বারের মতো রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ গঠন করা হয় এবং শামসুল আলম আহ্বায়ক নির্বাচিত হন। এ পরিষদে অন্য সংগঠনের দুই জন করে প্রতিনিধি রাখার ব্যবস্থা করা হয়। সেখান থেকে ছাত্ররা ১১ মার্চ ধর্মঘট আহ্বান করে এবং ধীরেন্দ্রনাথ দত্তকে তার সাহসী ভূমিকার জন্য ধন্যবাদ জানায়। ১১ মার্চের কর্মসূচী নির্ধারণের জন্য ১০ মার্চ ফজলুল হক হলে একসভা অনুষ্ঠিত হয়। ১১ মার্চ ভোরে পূর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন হল থেকে ছাত্ররা বের হয়ে আসে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ অন্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পূর্ণাঙ্গ ধর্মঘট পালিত হয়। সকালে ছাত্রদের একটি দল রমনা পোস্ট অফিসে গেলে তাদের গ্রেফতার করা হয়। ছাত্রদের আরও একটি দল রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গে সচিবালয়ের সামনে নবাব আবদুল গণি রোডে পিকেটিংয়ে অংশ নেয়। তারা গণপরিষদ ভবন (ভেঙ্গে পড়া জগন্নাথ হলের মিলনায়তন), প্রধানমন্ত্রীর বাসভবন বর্ধমান হাউস (বর্তমান বাংলা একাডেমি), হাইকোর্ট ও সচিবালয়ের সামনে দাঁড়িয়ে অফিস বর্জনের জন্য সবাইকে চাপ দিতে থাকে, ফলে বিভিন্ন স্থানে তাদের পুলিশের লাঠিচার্জের সম্মুখীন হতে হয়। একপর্যায়ে বিক্ষোভকারীরা খাদ্যমন্ত্রী সৈয়দ মোহাম্মদ আফজল ও শিক্ষামন্ত্রী আবদুল হামিদকে পদত্যাগপত্রে স্বাক্ষর করতে বাধ্য করে। এ বিক্ষোভ দমনের জন্য সরকার সেনাবাহিনী তলব করে। পূর্ব পাকিস্তানের জেনারেল অফিসার কমান্ডিং ব্রিগেডিয়ার আইয়ুব খান (পরে পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট) মেজর পীরজাদার অধীনে একদল পদাতিক সৈন্য নিয়োগ করেন এবং স্বয়ং গণপরিষদে গিয়ে খাজা নাজিমুদ্দিনকে বাবুর্চিখানার মধ্য দিয়ে বের করে আনেন। বিকেলে এর প্রতিবাদে সভা অনুষ্ঠিত হলে পুলিশ সভা প- করে দেয় এবং কয়েকজনকে গ্রেফতার করে। গ্রেফতারকৃতদের মধ্যে ছিলেন শামসুল হক, শেখ মুজিবুর রহমান, অলি আহাদ, শওকত আলী, কাজী গোলাম মাহবুব, রওশন আলম, রফিকুল আলম, আব্দুল লতিফ তালুকদার, শাহ্ মোঃ নাসিরুদ্দীন, নুরুল ইসলাম প্রমুখ।

add 1


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

অন্যান্য লেখা সমূহ

আজকের দিন-তারিখ

  • সোমবার (রাত ৪:২৪)
  • ২৬ ফেব্রুয়ারি, ২০২৪
  • ১৫ শাবান, ১৪৪৫
  • ১৩ ফাল্গুন, ১৪৩০ (বসন্তকাল)
Raytahost Facebook Sharing Powered By : Sundarban IT